আন্তর্জাতিক লবিং জোরদারে বিএনপির তৎপরতা

0
25

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক:‌ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আন্তর্জাতিক লবিং জোরদার করছে বিএনপি। একই সঙ্গে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বিভিন্ত আন্তর্জাতিক সংস্থার সমর্থন ও সহায়তা চাইতে শুরু করেছে দলটি। এ উদ্দেশে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে চিঠি পাঠানো হচ্ছে, নিয়োগ করা হয়েছে লবিস্ট এবং দলের শীর্ষনেতাদেরও বিদেশ সফর বেড়ে গেছে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের নিশ্চয়তা চায় বিএনপি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের সাজা নিয়ে জেলে যাওয়ার পর থেকেই জোরেশোরে কূটনীতিক তৎপরতা শুরু করে বিএনপি। তা এখন ক্রমেই জোরদার করা হচ্ছে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করতে ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক ও জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে চিঠি চালাচালি শুরু করা হয় দলের পক্ষ থেকে। তা এখনও অব্যাহত আছে।

সম্প্রতি বিএনপির ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এলিট শ্রেণীর কিছু অরাজনৈতিক লোকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সে সময় তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করার বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিবসহ আরও ক’জন নেতা লন্ডন গিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লবিং করেছেন বলে জানা গেছে।

এর বাইরে লন্ডন প্রবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিভিন্ন দেশের বিএনপির শাখা কমিটির নেতারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দলের পক্ষে লবিং করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৫ মাস বাকি। অক্টোবরেই এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে। বিএনপিও আশা করছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেভাবে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিতে তাদের আহ্বান জানানো হয়েছিল এবারও তাই করা হবে। কিন্তু অভিজ্ঞ মহল মনে করছে, তখন বিএনপি সংসদে থাকায় তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এবার সংসদের বাইরে থাকায় সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সংসদে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিসহ সব দল অংশ নেয়ার যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনীতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে অতীতে রাজপথে নেতিবাচক কর্মসূচী পালন করে বিদেশী কূটনীতিকসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সমর্থন না পাওয়ায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার ৫ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত তাকে মুক্ত করতে কঠোর কর্মসূচী দেয়নি বিএনপি। দফায় দফায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালনের পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। পাশাপাশি ঘরোয়া পরিবেশে সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে দলের নেতাকর্মীরা। জানা যায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আগামী ৩ মাস বিএনপি জোরেশোরে আন্তর্জাতিক লবিং চালিয়ে যাবেন।

সম্প্রতি বিএনপি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে বিএনপির এখনও কোন বৈঠক হয়নি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব কনসার্ন আছেন। তবে এখনও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৫ মাস সময় বাকি আছে। তাঁর এ বক্তব্য থেকেই বিএনপি যে আন্তর্জাতিক লবিং জোরদার করছে তা স্পষ্ট হয়েছে। দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিশেষ আদালতের রায়ে ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর পর থেকেই তাঁর মুক্তি ও সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্তসহ চিঠি দিয়ে দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে জোরালো চেষ্টা চালায় বিএনপি। কিন্তু বিএনপির কিছু অতীত কর্মকা- ও ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলেও আশানুরূপ পরিবর্তন আসবে এমন আস্থা না পেয়ে বিএনপির তৎপরতায় তেমন সাড়া দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক অঙ্গন। জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা বড় বড় দেশগুলো খালেদা জিয়ার কারাগারে থাকা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে এতদিন নীরবতা পালন করলেও সম্প্রতি কোন কোন দেশের কূটনীতিক মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের ডেকে মামলার পরিস্থিতি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানানো হয়। এ বিষয়ে কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অনুরোধ করা হয়। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়। এরপর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দায়সারা একটি বিবৃতি দিলেও অন্যান্য সংস্থা বা দেশের পক্ষ থেকে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তবে লবিং জোরদার করার পর এখন পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে বলে বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ ক’জন সিনিয়র নেতা এবং ক’জন জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী এ কূটনীতিক তৎপরতায় সক্রিয় রয়েছেন। তারা ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনৈতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সনের লন্ডন প্রবাসী ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বিভিন্ন মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এছাড়া ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইলসহ আরও ক’জন বিদেশী বিএনপির পক্ষে বিভিন্ন দেশে লবিং করছেন।

উল্লেখ্য, গত বছর ১০ মে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন -২০৩০’ চূড়ান্ত করার আগে ক’জন বিদেশী কূটনীতিকের সঙ্গেও এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে কথা বলা হয়। সে সময় এ ভিশন সম্পর্কে কূটনীতিকরাও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। পরে দলের পক্ষ থেকে ‘ভিশন -২০৩০’ ঘোষণার দিন উপস্থিত থাকতে ঢাকায় অবস্থানরত সব ক’টি দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বেশ ক’টি দেশের কূটনীতিকরা ওয়েস্টিন হোটেলে উপস্থিত ছিলেন। পরে ‘ভিশন -২০৩০’ এর কপি সব দেশের দূতাবাসে পাঠানো হয়। এরপর থেকে বিএনপি কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে।

বিএনপির পক্ষে আন্তর্জাতিক লবিংয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের আন্দোলন। কারণ ওই আন্দোলনকে দেশী-বিদেশী কেউ ভালভাবে নিতে পারেনি। আর এ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়েন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে যান। লন্ডনে অবস্থানকালে তার ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলের ভবিষ্যত করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় তারা দলের জন্য সুবিধা আদায় করতে আন্দোলনের পরিবর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকেই বিএনপির কিছু নেতা দেশে বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে অধিক সক্রিয় হয়ে পড়েন। বিদেশী কূটনীতিকরা নেতিবাচক কর্মসূচির পরিবর্তে ইতিবাচক কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালে বিএনপি কৌশল পরিবর্তন করে। এরপর ক’জন জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীর সহায়তায় ইতিবাচক কর্মসূচী পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। যে কারণে এখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন অব্যাহত রেখেছে দলটি।

জানা যায়, বিএনপির নেতারা ছাড়াও দলের পক্ষে যারা কূটনীতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. ইউনূস, বেসরকারী সংস্থা উবিনিগের ফরহাদ মাজহার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদসহ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদিআরব, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিএনপির কমিটিতে যারা আছেন তারাও লবিং করে বিএনপির জন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর এ কাজে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে এখন ঘণতন্ত্রের সঙ্কট চলছে। এ অবস্থার অবসানে বিদেশী কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা চাওয়া দোষের কিছু নয়। আমরা রাজনীতি করি দেশের মঙ্গল ও গণতন্ত্রের জন্য। এ বিষয়ে সহযোগিতা চাইতে আমরা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। সে সময় খালেদা জিয়ার মামলা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকরা দেশের বিষয়ে কিছু জানতে চাইলে আমরা গণতন্ত্রের স্বার্থেই আলাপ-আলোচনা করে থাকি। বিদেশী রাজনীতিকদের আমন্ত্রণে আমাদের দলের নেতারা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশে যেয়ে থাকে।

সূত্র :  purboposhchim

LEAVE A REPLY