ওপার বাংলার কবি ও লেখক, চিরশ্রী দেবনাথ এর কল্পবিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ‘’ মনখারাপের বিজ্ঞানী’’

0
182
ওপার বাংলার কবি ও লেখক, চিরশ্রী দেবনাথ

মনখারাপের বিজ্ঞানী

……………….চিরশ্রী

একটি দিন। দীর্ঘ দীর্ঘ গাছ।
গোধূলি বয়ে যাচ্ছে। লাল রঙের আকাশ।
রাস্তা। মিছিল হচ্ছে। কিছু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে নীরবে। সবাই এক উচ্চতার। হলুদ রঙের পোশাক।
এটাই এখন শোকের পোশাক।
নয়শো বছর আগে শোকের রঙ কালো ছিল। এখন মানুষ শোকের দিন হলুদ পরে।
সবার হাতে ছোট ছোট পাতার পতাকা। একজন বিজ্ঞানী মারা গেছেন। তার জন্য সবার মনখারাপ।
এই মনখারাপটাকে চোখের তলায় রেখে তাই একদল মানুষ হেঁটে যাচ্ছে।
মনখারাপ খুব মূল্যবান একটি জিনিস।
কয়েকশো বছর আগে পৃথিবী থেকে মনখারাপ হারিয়ে গিয়েছিল।
তখন একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের অভালোবাসাবাসি হলেই, পট করে খুন করে ফেলতো। কিন্তু তারপর সে কাঁদতো না।
রক্তটক্ত মুছে, হাসতে হাসতে জল খেতো।
খুব মুশকিল হয়ে গেলো। রোবটেরা অনেক মাথা খাটিয়েও মন বস্তুটার সন্ধান পেলো না।
মানুষ তখন খুব অলস । যন্ত্ররাই চালাচ্ছে পৃথিবী।
আবার রোবট নষ্ট হলে মানুষ ছাড়া তাদের ঠিক করা যায় না, তাই রোবটরা চায় মানুষ বাঁচুক।
ঝগড়া আর মারামারি না চলুক।
মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করতে সব মানুষের উচ্চতা আর গায়ের রঙ এক করে দেয়া হলো।

পৃথিবী তখন দীর্ঘ ছায়াবৃক্ষে ভরা। বৃক্ষকাতর পৃথিবী বলা যায়। তার তীরে তীরে হিংসা দীর্ন মেধাবী মানুষের ভীর।
তাদের কোন মনখারাপ নেই।
তাই কান্না নেই।
হাসিও নেই।
বিষাদও নেই।
ভালোবাসার বিপন্নতাও নেই।
সেইসময় একজন বিজ্ঞানী এলেন। তিনি বললেন মানুষকে দুটো ভাগে ভাগ করতে হবে।
যাদের মধ্যে একটু আবেগ আছে তারা নীল গ্রহে থাকুক।
যাদের মধ্যে আবেগ এক্কেবারে জিরোতে ঠেকেছে, তাদের অন্য গ্রহদুটোতে পাঠানো হোক।

হোয়াইট ড্রিম A তে এইসব মনখারাপ হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পাঠিয়ে দেয়া হলো। মিল্কি ওয়ে পেরিয়ে হোয়াইট ড্রিম A, সেখানে যেতে সময় লাগলো ঠিক একশো বছর, ঠিক পাশেই হোয়াইট ড্রিম B, যাদের জায়গা হলো না, তারা B তে।

তারপর সেই বিজ্ঞানী মন খারাপের চাষাবাদ আরম্ভ করলেন।
তিনি মাথায় রাখলেন সিঙ্গুলারিটি।
একজন পুরুষ এবং একজন নারী।
মুখোমুখি বসবে।
মাঝখানে একটি ব্ল্যাকবস্ক।
বাতাসবিহীন।
নিঃসীম অন্ধকার।
তারা নির্বাক থাকবে।
এই ব্ল্যাকবস্কটিতে টেনে নেওয়া হবে তাদের মন।
একশ ভোল্টের ঠান্ডা তরিৎ প্রবাহ
ফ্রিজড হয়ে যাবে দুটো মন
সমস্ত বিচ্ছিন্নতা মিশে চরম সিঙ্গুলার
সেখান থেকে ঝরতে আরম্ভ করবে বিন্দু বিন্দু মেদ
এরই নাম অশ্রু, এরই নাম মনখারাপ,
এরই নাম না ফেরার ব্ল্যাকহোল।
…এরই নাম বিজ্ঞানও ক্রমাগত ভুল।

এভাবে আস্তে আস্তে পৃথিবীর বুকে জোড়া জোড়া মনখারাপ ফিরে এসেছিল।
শোকের রঙ ফিকে হতে হতে হলুদ হয়ে গেলো।

সেই বিজ্ঞানী আজ মারা গেছেন।

আর মনখারাপের জাতকেরা হলুদ পোশাকে পাতার পতাকা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, বৃক্ষ সঙ্কুল পৃথিবীতে।

লেখক পরিচিতি: চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার। দুজনেই প্রয়াত। তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি। বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, এিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার। কবিতা ভালবাসেন তাই লিখে যেতে চান। কবিতায় নিজের কথা, মেয়েদের কথা বলতে ভালবাসেন। কবির প্রথম কবিতার বই দুইহাজার ষোলতে আগরতলা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে । বইয়ের নাম “জলবিকেলে মেঘের ছায়া “।

প্রকাশক সতন্ত্র মেধা। ত্রিপুরার স্রোত প্রকাশনা সংস্থা থেকে, দুইহাজার সতেরোতে প্রকাশিত হয়েছে, লেখিকার দ্বিতীয় কবিতার বই” ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “।পরবর্তী বই ত্রিপুরার নীহারিকা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হবে, “প্রেমে সন্ত্রাসে “।

LEAVE A REPLY