ওপার বাংলার কবি ও লেখক, চিরশ্রী দেবনাথ এর লেখা ছোট গল্প ‘’বকুল গন্ধা’’

0
143

বকুল গন্ধা

…….চিরশ্রী দেবনাথ

আমার এই ছোট্ট আস্তানাটি নিছকই মেয়েলি একটি ঘর। মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েলি কথাটি কত ভুল। মেয়েপনার সঙ্গে ছেলেপনা যোগ না হলে কি সম্পূর্ণ হয় মেয়েভাব, তার আগে পর্যন্ত সে পাতে ওঠে না।
এই যে আমার আস্তানা মানে ছোট্ট একটি ঘর, দরজা ঘেঁষে বসে থাকা ভীষণ ছোট্ট একটি ক্লান্ত বারান্দা এবং গ্রিল পেরিয়ে একখানা আস্তো আকাশ, এসবই আমি কপালগুণে পেয়েছি। তাই এ ঘরে প্রতিদিন ছয়টি ঋতু আসে, মেঘ বৃষ্টি ঝড় তুফান রোদ কুয়াশা আর গন্ধ, কিসের গন্ধ..এ হলো আমার বেঁচে থাকার অনবরত প্রমাণ, আমার গায়ের বকুল গন্ধ, হাসলেন বুঝি, সত্যবতী মৎসগন্ধা ছিলেন আর আমি এযুগের বকুল গন্ধা। আমার নামটি …দরকার নেই।

চায়ের জল ফুটে গেছে, চা করে নিই। আজকে আমার অফিস বন্ধ, আজ বৃহস্পতিবার, আজই আমাদের ছুটি থাকে। বি এ পাশ করে সাদামাটা কমখরচের একটা ছয়মাসের ফ্যাশন ডিজাইনিং এর কোর্স করেছিলাম, সরকারি। অতি সাধারণ ছাত্রী আমি, ছয়মাসের কোর্সে আমি জানি কি করে অসাধারণ হয়ে উঠলাম, পেলাম সেরা ছাত্রী র সার্টিফিকেট আর সেই সঙ্গে এই চাকরি, ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং বিক্রি, দুটোই নিয়ে চলতে থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে।
আমার বিয়ে হয়েছে। অভ্র চাকরি করতো একটি চিটফান্ডে, তখন খুব ভালো চলছিল সেই চাকরি। কালো মেয়ে, সুশ্রী নই, টাকার জোরও নেই, তাই আমার এই চাকরি জোটার সঙ্গে সঙ্গে বাবা পাত্রস্থ করলেন। সবে আমাদের যৌথ জীবন শুরু হয়েছিলো।
তারপরেই চিটফান্ডের ওলটপালট এবং অভ্রর চাকরি চলে যাওয়া। তবু আমার চাকরি ছিলো, চলে যাচ্ছিল, এদিকে দিন রাত পাওনাদারদের ফোন, বাড়ি আসা, অভ্র দিনের পর দিন কেমন যেনো হয়ে যেতে লাগলো। একদিন বেরোচ্ছি বলে বাড়ি থেকে বেরুলো, আর ফেরেনি, রেললাইন ডাকছিলো তাকে।
সেই পুরনো পাড়া থেকে চলে এলাম আরেকটি পাড়ায়। বলা যায় খুব কম ভাড়ায় পেয়ে গেলাম এই ঘরটি। বাপের বাড়ি গেলাম না। ওখানে দুভাইের সংসার, মা বাবা, ছোট বোন, আমাকে এমনিতেই দ্রুত বিয়ে দিয়ে বাবা মা ভারমুক্ত হতে চেয়েছিলেন, তাই আর তাদের ঘাড়ে উঠে ওদেরকে বিব্রত করতে চাই না।
ভালো আছি বলি সবসময় নিজেকে। আমার কাজটিকে আমি পুজো মনে করি। আমার আরো বহু কিছু শেখার শখ, কিভাবে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আজকাল তাই অফিস থেকে ফিরেই কিছু খেয়ে নেট সার্চ করতে বসি, খুজতে থাকি ফ্যাশনের দুনিয়া, হাল হকিকত। একটু টাকা জমাতে পারলে ল্যাপটপ কিনবো। নিজের ওপর ভীষণ বিশ্বাস আমার, কোন না ভাবে আমি কাজের জগৎ টাকে জয় করবো। শুধু ..এই যে মেয়ে, একা মেয়ে, বিধবা মেয়ে তার রূপ থাকুক আর না থাকুক একটা শরীর আছে, আছে পাড়া ভর্তি লোক। একটা নিতান্তই সাধারণ মেয়ে একা থাকবে, নিজের কাজ নিয়ে, আবার গালভরা নাম ফ্যাশন ডিজাইনিং, অফিসে যাবে, রাত করে বাড়িতে ফিরবে, তার সম্পর্কে একটু নিন্দে না ছড়ালে কি হয়, তার যাওয়া আসা খেয়াল রাখতে হবে, কার কার সঙ্গে কোথায় কোথায় যায় নজরদারি করতে হবে, এগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা তো আশেপাশের মানুষের এক্তিয়ারভুক্ত। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে ভাই আসে, মাও আসে মাঝে মধ্যে, এটাসেটা বলে। কিছুতেই কি এরকম মানা যায়! আবার না মেনেও কিছু করার নেই।
চা শেষ হয়ে গেছে কোনকালে, সন্ধ্যা নেমে নেমে রাত হয়ে গেছে, রাতে নিজের জন্য একটু খিচুড়ি করবো সঙ্গে দুপিস্ বেগুনভাজা। তারপর কিছু ডিজাইন করবো বসে বসে, নিজস্ব, সেগুলোকে পোশাকের সঙ্গে মিশিয়ে কিছু ফিউশন আনার চেষ্টা। অফিসে গেলে কম্পিউটারটা পাওয়া যায়, এটা সবচাইতে সুবিধে, তবে এ লাইনে নিজের আইডিয়া কখনোই অন্যের কাছে প্রকাশ করতে নেই, চুরি হয়ে যায় মেধা, মনন।
প্রেসারকুকার টা গ্যাসে চাপিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, অমাবস্যা আর পুর্নিমার মাঝামাঝি সময় যাচ্ছে এখন, মরা আলো কামড়ে আছে পৃথিবী, মনে হয় আমার মতোই মাটি আঁকড়ে আছে এই আলো।
অভ্রকে ভালো করে চেনাই হলো না, তার আগেই এতোসব উথালপাতাল। অভ্রও আমাকে বিয়ে করেছিল দায়ে পড়ে, যেহেতু তার নিজের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত ছিল না। তাই বোধহয় কিছু শরীর শরীর খেলা ছাড়া মন দানা বাঁধেনি কোথাও। কই তেমন কিছু স্মৃতি তো মনে পড়ে না, যাতে দুচোখ জলে ভরে ওঠে। একটু একটু করে আমার সামনে বিশাল একটা জগৎ খুলে যাচ্ছে। খেয়োখেয়ি, ইর্ষা, একে অন্যকে ল্যাং দেওয়া, কুশ্রীতা সব চলছে পায়ে পা মিলিয়ে, তবুও যেন একটা তীব্র আলো আমাকে ছেদ করে কোথাও। এটা হলো গ্ল্যামার। আমি টের পাচ্ছি আমার মধ্যে আছে দারুণ ক্ষমতা, বোধহয় বোধহয় আমি কিছু ছুঁতে পারবো।
আমি এই ভর রাতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা বড়ো মোটামুটি দামী আয়না লাগিয়েছি আমার ঘরে। এটা বহুদিন পর আমার একটা বিলাসিতা। বাড়িতে মাঝে মাঝে কিছু পোশাক তৈরী করি সেগুলো পরে দেখি, কেমন হলো। অফিসে যাই খুব সাদামাটা সালোয়ার পরে। অন্য মেয়ে স্টাফরা বেশ সাজগোজ করে। আমার এসবে মন দেওয়ার মতো আর্থিক এবং মানসিক পরিস্থিতিই ছিলো না। এখন তো আবার অন্য
জীবন । তবে আজকাল আমার একটু সাজতে ইচ্ছে করে। একটু অন্যরকম করে দেখি নিজেকে না হয়।
কখন সকাল হয়ে গেছে, এসব উল্টোপাল্টায় আর ঘুম হলো না। ভাবছি একঘন্টা ঘুমিয়ে নেই। তারপর উঠে ধীরেসুস্থে যাবো অফিসে।
ধরমরিয়ে উঠলাম। নাহ্ ঠিকই আছে সময়। কিছু রাঁধবো না। দুধ কর্নফ্লেক্স খাবো। স্নান করলাম শ্যাম্পু ট্যাম্পু দিয়ে। খাওয়া দাওয়া করলাম। ভাবলাম আজকেই বদলাবো নিজের লুক। বেশ কায়দা করে চুলটা উঁচুতে তুলে বাঁধলাম। শাড়িই পড়লাম একটু অন্যরকম করে, ব্লাউজের ডিজাইন নিজের করা, অনেক ভেবে, যারা অফিসে কাজ করেন সেই মেয়েদের জন্য “। বেশ জুতো টগবগিয়ে বেরোলাম। মোরের মাথায় অটোর জন্য দাঁড়াতেই অনেকগুলো চোখ আমাকে দেখে নিলো। আগে তো কেউ তাকাতোই না, তাকালেও মুগ্ধতা নয়, অন্য দৃষ্টি। আজ তাদের চোখে মুগ্ধতা। এটাও বেশ উপভোগ্য লাগলো। অফিসেও তাই।
কাজ শেষে সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরলাম, খুব সাধারণ হলেও মনে হলো কিছু একটা অতিক্রম করেছি! মন দিয়ে কাজ করতে লাগলাম, হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। আরে বস্! উনি তো কখনো আমাকে ফোন করেননি। বললেন আমার ডিজাইন ওনার ভালো লাগে। সামনে একটা প্রদর্শনীর দায়িত্ব উনি আমাকে দিতে চান। সবশেষে বললেন আজ তো দারুণ দেখাচ্ছিল তোমাকে, এভাবেই থাকবে।
আমার সাধারণ জীবনে এটা আর একটা সিঁড়ি। নিজেকে বদলে ফেলা, সাফল্য ছুঁতে হবে আমার। নিছক সাধারণ একটি মেয়ে হয়ে থাকবো না আমি, আমাকে অসাধারণ হতেই হবে।
পরমুহূর্তেই মনে হলো, এটা কি অন্যায় হলো। অভ্র চলে যাবার পর এ কি আমার নীচে নেমে যাওয়া। এই সাজগোজ করলাম, অন্যের চোখকে মুগ্ধ করার জন্য।
অফিসে আগে তো একদম সাধারণ যেতাম, কেউ কিছু বলেনি কোনদিন। কোন ভালো লাগার ইঙ্গিত, আর সব মেয়েদের মতো আমিও কি চাইনি। শুধু অবিরাম একটি ঝড় বয়ে গেলো আমার ওপর দিয়ে কয়েকটি বছর ধরে, এর আগেও যখন ছাত্রী ছিলাম, সবকিছুতেই টানাটানি, আর মানিয়ে নেওয়া ।
শ্বাস ফেলে এখন বড়ো বাঁচতে ইচ্ছে করে নিজের মতো করে। বহু মেয়ের এবয়সে জীবনই শুরু হয় না, আমার কি শুরু হয়েছে এখন না এ আমার থেমে যাওয়া। সবকিছু কেমন কুয়াশা কুয়াশা লাগছে। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। একেই বোধহয় বলে নিম্নমধ্যবিত্ত মানসিকতা। গন্ডি পেরোতে ইচ্ছে করে, তবুও মনকে শিকল পরিয়ে রাখি, কিছুতেই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারি না।
এজন্য আমাকে যদি অন্যকিছু আপোষ করতে হয় তবে! এ দুনিয়াটাই যে নোংরা, তখন কি হবে, তখন না হয় দেখা যাবে, আস্তে আস্তে ফুঃ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম
টেবিলে জমে থাকা কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো, তীব্র গরমে ফুলস্পীডে ঘুরতে থাকা ফ্যানের বাতাসে রঙবেরঙের কাপড়ের টুকরো উড়তে লাগলো ঘরময় ….

লেখক পরিচিতি: চিরশ্রী দেবনাথের, জন্ম ১৯৭৯ এর ১২ ফেব্রুয়ারি উত্তরপূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে। বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার। দুজনেই প্রয়াত। তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি। বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন। পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প পুরস্কার, স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার, এিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার। কবিতা ভালবাসেন তাই লিখে যেতে চান। কবিতায় নিজের কথা, মেয়েদের কথা বলতে ভালবাসেন। কবির প্রথম কবিতার বই দুইহাজার ষোলতে আগরতলা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে । বইয়ের নাম “জলবিকেলে মেঘের ছায়া “।

প্রকাশক সতন্ত্র মেধা। ত্রিপুরার স্রোত প্রকাশনা সংস্থা থেকে, দুইহাজার সতেরোতে প্রকাশিত হয়েছে, লেখিকার দ্বিতীয় কবিতার বই” ঋতুক্ষরণের রোদ চশমায় “।পরবর্তী বই ত্রিপুরার নীহারিকা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হবে, “প্রেমে সন্ত্রাসে “।

LEAVE A REPLY