ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল এর লেখা জীবন ছোঁয়া ছোট গল্প ‘’ কুহুর চার অধ্যায়’’

0
110
ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল

কুহুর চার অধ্যায়

                                  শাম্মী তুলতুল

সবাই যখন ঘুমে অচেতন ঠিক তখনি কুহূর মমতাময়ী মা চলে গেছেন অচিন ঠিকানায়; যেখান থেকে কেউ ফিরতে পারেনা- কেউ ফেরেও না। মা বিহীন সংসারটা কেমন করে চলবে, কে দেখভাল করবে, কেমন করে বেড়ে উঠবে অবোধ দুটি শিশু; কুহু নিজেও কি পারবে সরল সমিকরনের পথে এগিয়ে যেতে! ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় কুহূ। তাই কষ্ট, দায়িত্ব সবই তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করছলি। পাড়ার সকলে মিলে কুহূদের বাড়ি ঘিরে হাহাকার তুলছিল। দেখছে কুহূর আত্মচিৎকার। জন্মের সময় মানুষকে উৎসবের মাঝে বরণ করে নেওয়া হয়। মৃত্যুর সময়টাতেও হয় উৎসব। শুধু পার্থক্য হাসি আর কান্নার। বাড়ির কয়েকজন মহিলা কুহূর মায়ের মরদেহকে গোসল করিয়ে সামনের উঠোনে শুইয়ে দলি। বাড়ির মহিলারা সকলে কোরআন পাঠ করছে । কুহুর ছোট বোন কাকন আর ছোট ভাই কেটুর বুক ভাঙ্গা কান্নায় আকাশ পাতাল এক হচ্ছ। এরই মধ্যে কুহূর ছোট চাচা কুহুর বাবা ও আতœীয় স্বজন কে ফোন করে জানিয়ে দেয় কুহূর মায়ের মৃত্যুর খবর। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যাস্তের সঙ্গে নিস্তদ্বতায় ভরে যায় পুরো বাড়ি। থমথম করছে চারদিক । আছরের আযানের পর পরই কুহুর মাকে মাটি দেওয়া হল । মানুষ এই সংকীর্ণ জীবনে কত স্বপ্নই না দেখে। কত সাধ আহলাদ থাকে। কুহুর মায়েরও ই”েছ ছিল মেয়েকে বিয়ে দেবে ধুমধাম করে; তাই মেয়ের জামাইয়ের জন্য আগে থেকেই বানিয়ে রেখেছিলেন হাতে বোনা পাঞ্জাবী আর নক্সী কাথাঁ। নাতী-নাতনীর জন্য বানিয়েছিলেন কাথাঁ, ,নিমা আরো কত কি। পাড়ার মধ্যে কুহুদের বাড়িটা সবার চাইতে বড়, অনেক জমি জমার মালিক ছিলেন তারা। কিন্তু বন্যা সর্বস্ব করে ছাড়ে তাদের। শুধু বাড়ীটাই জীর্ণভাবে অসহায়ের মতো দাড়িয়ে আছে। বন্যার কারণে তখন থেকেই এই স্ব”ছল পরিবারে অভাব অনটন ভীড় করছে। তাই কুহুর বাবা অর্থাৎ আনিস সাহেব অভাবের কারণে চাকরী নেয় ঢাকার একটি এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরীতে। মা মারা যাওয়ার পর দিনরাত চাচীর সংসারের কাজ সামলানোর ফলে কুহুর আর কলেজে যাওয়া হয় না। কাজ করেই যদি বাঁচতো মনকে বুঝ দেওয়া যেতো। কিন্তু সুযোগ পেলেই চাচী যা থা বলতে এতোটুকু দ্বিধাবোধ করেননা। কাজ উনিশবিশ হলেই রায়ের পাহাড়। গা রি রি করার মতো কটুউক্তি। কুহুর এলোমেলো জীবনের মায়া এখন আর নেই, কিন্তু অবুঝ নিরাপরাধ দুটো জীবনতো নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। তাই কুহু সিদ্ধান্ত নিলো চলে যাবে শহরে বাবার কাছে। শহরে গয়িে ভাই বোন দুটোকে মানুষ করতে হব।ে এখানে থাকলে কিছুই হবে না। ব্যাপারটা বাড়ীতে সবাইকে জানিয়ে দিল কুহু। জন্মের পর থেকে বাইশটা বছর পার হলো এই বাড়িতে।দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মায়ের মুখচ্ছবি। কত আনন্দ এই বাড়ির আনাচে কানাচে। বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে কুহুর কষ্ট হ”েছ অনকে। কিন্তু উপায় নেই। যেতেই হবে। মায়ের মৃত্যুর একচল্লিশ দিনের মাথায় বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভাইবোন দুটোকে সঙ্গে নিয়ে চলে এল বাস স্ট্যান্ডে।
কাকন জানতে চাইলো, আপু আমরা কেন যা”িছ?
কুহু বলল, আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য।
বাসে উঠে বসল তিনজন। গাড়ি চলছে তো চলছে। কখনো গাড়ি দ্র“ত চলছে, কখনো আস্তে, কখনো বা গাড়ি গর্তে পড়ছে, হাড়মোড় সব নাড়িয়ে দিচ্ছে।কিন্তু কুহুর সেদিকে এততুকু খেয়াল নেই, শুধু ভাবছে, কি করব, কি হবে চলে তো যাচ্ছি পিছনের সব অতীত ফেলে অজানা গনতব্যে। যে বয়সে কুহু হাসবে, খেলবে সইদের নিয়ে গল্পগুজব করবে, প্রিয় কোন মানুষের সঙ্গে হাতে হাত রেখে খোলা আকাশ দেখবে। সেই বয়সে দায়িত্ব কাধে ভর করছে তার । মনে হ”েছ সেই দিন সেই বয়স চলে গেছে একেবেঁকে অলিগলি মহাসড়ক পেড়িয়ে। পরিবারটা সামলানোই যেন তার এখন একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়য়িছে।ে ভাবতে ভাবতে কখন যে বাস গন্তব্যে চলে এলো কুহু টের পেল না। বাস থেকে নেমে কুহু কম ভাড়ায় একটা সিএনজি ঠিক করলো, গাড়িতে মালপত্র নিয়ে সবাই বসল। সিএনজি চড়ে আর কিছু দুর যেতেই একজন পানের দোকানদারকে বাড়ির ঠিকানাটি জানতে চাইলে তিনি সঠিক ঠিকানাটি বলে দিলেন। বাড়ির দারোয়ানকে সকল পরিচয় দিয়ে সবাই দোতলায় উঠল।
কিš‘ চাবি? নিচে গিয়ে দারোয়ানকে চাবির কথা বললে, তিনি তিন তলায় বাড়ীওয়ালার কাছে যেতে বলে। ভাড়াটিয়ার ডুপ্লিকেট চাবি বাড়িওয়ালার কাছে থাকেন। দরজায় কলিং বেল টিপতেই একজন মহিলা দরজা খুললেন। তিনি সব জিজ্ঞেস করলেন,তাকেও সব পরিচয় দিলো।তিনিও নিজের পরিচয় দিলেন। তিনি হলেন বাড়িওয়ালী। বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে কুহু দোতলায় দরজা খুলে ডুকল। কাকন আর কেটুকে বলল, তোরা একটু বিশ্রাম নে। আমি বাবাকে ফোন করে আসি। কিš‘ ফোন কিভাবে করবে এখানে কোথায় কি আছে তা তো কুহু জানে না। বাড়িওয়ালার বাসায় নিশ্চয় ফোন আছে। কিš‘ প্রথম দিন তার কাছে যাওয়া কি ঠিক হবে? শেষমশে সব হিসাব বাদ দিয়ে কুহু বাড়ীওয়ালার বাসায় গেল। কুহু কলিং বেল টিপল। বাড়িওয়ালী দরজা খুললেন।
কুহু আমতা আমতা করে বলল, আন্টি একটা ফোন করতে পারব? আমরা এসেছি তা বাবাকে জানাতে ।
একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বাড়িওয়ালী ফোনটা এগিয়ে দিলেন । ফোন করে বাবাকে বিস্তারিত জানানো হলো। মনে হলো বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন। পড়বেনিইতো। কাকন আর কেটুর লেখাপড়ার দায়িত্ব আরও দ্বগিুণ বেড়ে গেল বাবার। শহরে ভাল কোন স্কুলে দুজনকে নতুন করে ভর্তি করাতে হবে। খরচ অনেক, কুহু তাই চাকরী করার সিদ্ধান্ত নিলো। এভাবে কাটল সপ্তাহ কয়েক। পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে অনেক যায়গায় চেষ্টা করল। কন্তিু সব যায়গায় চাকরি ঝুলে থাকল। এরই মধে কুহু বাড়ীওয়ালার পরিবারের সকল সদস্য সম্পর্কে জানতে পারল । বকিলেে প্রায় সময় কুহু ছাদে উঠে হাটাহাটি করার জন্য। তখন বাড়িওয়ালীর ছোট মেয়ে ফারিহার সঙ্গে দেখা হয়। কুহুর সঙ্গে ফারিহার অনেক ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কুহু ধীরে ধীরে ফারিহার সব বিষয় জানতে পারল । দূর সর্ম্পকরে খালাতো ভাই রাতুলের সঙ্গে ফারিহার সর্ম্পক, সে থাকে পাশের বিল্ডিং এ। যে কারণে ফারহিার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই। স্বাধীনতা নেয়। কড়াকড়রি মধ্যে রাখে বাসায় সবাই তাকে। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হাজৎ এ বাস করাই যেন তার কাজ।মূল্যহীন একটা জীবন নিয়ে তার দিনরাত্রি। ভালোবাসা কাউকে এত শাস্তি দেয় আগে জানা ছিল না কুহুর? কোথায় যাবে মেয়েটা? যার জন্য ভালবাসার আগুণে পুড়ছে সে কি ফারিহাকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে ছাই হতে প্রস্তুত? এসব অনেক ভাবনায় ডুবে ডুবে প্রতিরাত কুহুর চোখ চিকচিক করে । এরই মধ্যে কুহুর একটা গতি হল।একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে ডাক পরল। কুহু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এভাবে অনেক দিন পাড় হল। একদিন বিকেল বেলা রাতুল কুহুর সঙ্গে ভাব বিনিময় করার চেষ্টা করছিল ।কুহু তো অবাক। কুহু যখনি ছাদে ওঠে,রাতুল তার সঙ্গে হাসে, কথা বলতে চায়। কুহুর বুঝতে বাকি রইল না কি ঘটছে।এভাবে অনেকদিন চলল। কিন্তু‘ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য কুহুরও একটু একটু রাতুলকে ভালো লাগতে শুর করলো। কিন্তু কুহু নিজেকে সামলিয়ে ফেলল।“ কি হচ্ছে এসব? অন্নের ভালবাসা নিয়ে টানাটানি। বেহাইয়া। একে কিছুতেই পস্রয় দেওয়া যাবে না । কুহু নিজেই নিজেকে দোষারোপ করে ধিক্কার দিল। ইতিমধ্যে রাতুল বাসা ছেড়ে চলে গেল ৷ রাতুল যাওয়ার আগে কুহুকে একবার সাক্ষাতের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু কুহু এসব একেবারে মাথায় আনলনা । কুহু রাতুলের ব্যাপারটা জানানো দরকার মনে করলো ফারিহাকে।কিন্তু ফারিহা বিশ্বাস করলো না,উল্টো কুহুকে ভুল বুঝল। কিভাবে বিশ্বাস করবে? ফারিহার বয়স কম, তাই কিছুই এখন তার মাথায় ডুকবেনা । কুহু আর এ বিষয়ে ফারিহাকে কিছু বলল না ।
এভাবে দিন,মাস গড়িয়ে কাটল কয়েক বছর। এরই মধ্যে কুহুর প্রমোশন হলো। কাকন অনার্স পড়ছে কিছুদিন পর ফাইনাল দিবে। কেটুও কারীগরী পাশ করে চাকরী করছে। কুহু বাসাটা বদলাবে ভাবছে। কারণ দুই রুমের এই বাসায় অনেক বছর কষ্ট করে দিন কাটল তাদের। কাকনকে বিয়ে দিতে হলে বড় বাসা খুব প্রয়োজন। বাসা বদলাবে কুহু কথাটি বাড়ওিয়ালাকে জানিয়ে দিল। কুহু পনের দিনের মাথায় একটা বাসা পেয়ে গেল। যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হল। যাওয়ার আগে কুহু ছাদে নতুন কাপড় চোপড় ধুয়ে শুকিয়ে নিচ্ছিল প্রতিদিন। এমন সময় রাতুলদের বিল্ডিংয়ে নতুন এক মশাই প্রায় কুহুকে উকি মারে, কুহু দেখেও না দেখার ভান করে। ভাবল কোন ফাজিল টাজিল হবে হয়তো। চলে এল তারা নতুন বাসায় । কুহুদের নতুন বাসাটি আগের চাইতে অনকে বড়। নীচ তলায়। সামনে বড় উঠোন আছে । নতুন পরিবেশে মানিয়ে চলার চেষ্টা তাদের এখন ।
দিন যায়, রাত যায় চোখের পানি টলটল করে কুহুর। কারো বিয়ে হতে দেখলেই নিজের হাতে মেহেদী পড়ে বউ হতে মন চায় কুহুর। কুহু বুঝতে পারে বাবা খুব অনুভব করে তার কষ্ট। জীবনটা আসলেই একটা ঘুড়ি। যতক্ষণ নিজে উড়াবে ততক্ষণ উড়বে। তেমনি যতক্ষণ মানুষ বেঁচে থাকবে ততক্ষণ জীবন যুদ্ধ করতেই থাকবে। শেষ রাতে যদিও প্রতিদিন চোখের পাতায় ঘুম এসে যায় কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না কুহুর। ঘুমটিকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিন রাতের সাথে যুদ্ধ হয় তার। যুদ্ধ করেই ঘুম ফিরিয়ে আনে সে ।
একদিন সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার সময় কুহুর ক্রস হলো আগের বাসায় উঁকি মারা সেই ছেলেটির সঙ্গে। কুহু দেখে চমকে গেলো। এই ছেলে এখানে কেন? এভাবে প্রায় ছেলেটি আসা যাওয়া করে। তাদের মধ্যে প্রায় দেখা হয়। কুহু হাসে, ছেলেটিও হাসে। একটা সময় তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক হয়ে যায়। নতুন বাড়িওয়ালা ছেলেটির চাচা । নাম বিদ্যুৎ। দুই বছর ধরে সম্পর্ক চলছিল তাদের। কিন্তু দুই বছররে মাথায় হঠাৎ একদিন বিদ্যুৎ বলল, কুহু আমি বিদেশ যা”িছ। দু,বছর পর বিয়ে করে তোমাকেও নিয়ে যাবো। তুমি অপক্ষো করো । কুহু শুনে আকাশ থেকে পড়ল। জীবনের এত চড়াই উৎরাই পার করে একটু সুখের সময়ে বিদ্যুৎ এসব কি বলছ? আবার কুহুর জীবনটা অন্ধকারে ছেয়ে গেল। তবুও কুহু বিশ্বাসে বুক বাধল। বিদ্যুৎ চলে গেল বিদেশে। কুহুর অপেক্ষার দিন গোনা শুর“। এভাবে কাটল দুইটা বছর। এদিকে বাবার শরীরটা দিন দিন খারাপের পথে। তাই বাবা কুহুকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির। কুহুর পর পর কাকনকে বিয়ে দিয়ে কেটুর একটা ব্যবস্থা করে বাবা বাড়ি চলে যাবে। বাবাকে অনেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কুহু সময় পাড় করার চষ্টো করল। অবশেষে কুহুর অপেক্ষার অবসান হল। বিদ্যুৎ চুরান্ত কথা বলার জন্য একদনি কুহুকে ফোন করলো । কুহুর সঙ্গে অনেক আলাপ করল, কিন্তু আসল কথা বলার আগে কাচুমাচু করছিল।
কুহু তখন বলল, বিদ্যুৎ আসল কথাটা বল। তুমি কবে আসবে?
বিদ্যুৎ কাপা কাপা স্বরে বলল, কুহু আমি বিয়ে করে ফেলেছি, বাবা মুত্যু শয্যায় ছিলেন। বাবার জেদের কারণে তারই পছন্দ করা মেয়ের সঙ্গে ফোনে বিয়ে করেছি। বাবার কথা না রেখে পারলাম না। আমাকে মাফ করে দিও। তোমাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম না, যা হয়েছে ভুলে যেও।
মুহুর্তেই কুহু জড় পদার্থ হয়ে গেল। তার সাজানো স্বপ্ন ভেঙ্গে যাচ্ছে। যে স্বপ্নের ফেরী করে কুহু এতদিন ঘুমের মধ্যে বেড়িয়েছিল। সেই স্বপ্ন? দুই বছর সম্পর্ক , দুই বছর অপেক্ষা। নিজেকে উজাড় করে দেওয়া৷ এতোই কি সহজ ভুলে যাওয়া ?এতই কি সহজ মাফ করে দেওয়া? কুহু ভাবে কেন এমন হলো? এটা কি কপালে ছিল? কপালের দোষ? না কপালকে দোষ দিব কেন? বিদ্যুৎ ঠিক ছিল না। সে বিদেশে গিয়ে বদলে গেছে। বাবার নাম ভাঙ্গিয়েছে। যতটুকু কষ্ট আমি পেয়েছি তার চাইতে দ্বিগুন কষ্ট সে পাবে। কুহু ইচ্ছেমত কাঁদলো। কেঁদে কেঁদে মনকে বোঝালো, সে আর কাঁদবে না। প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে সামলালো।
কয়েকদিনের মধ্যে কুহু নিজেকে স্বাভাবিক করে অফিসের কাজে মন দিল । একদনি অফিসে যাওয়ার পথে রাস্তার মাঝখানে হৈ হুল্লোড় দেখে কুহু ট্যাঁকসিক্যাব এর ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল ,দেখল রাস্তায় প্রচুর ভীর। পথচারীকে জিজ্ঞেস করলে বলে , এক্সিডেন্ট হয়েছে , গাড়ী ভাংচুর চলছে।
কুহু সাথে সাথে গাড়ী থেকে নামল। ভীড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে একটি ছেলে। কুহু ছেলেটির মুখ দেখে অবাক হয়ে গলে । দেখল ছেলেটি অন্য কেউ নয় রাতুল। কুহু দেরি না করে অন্যান্য পথচারীর সহযোগিতায় রাতুলকে নিজের ক্যাব এ তুলে নিলো। ড্রাইভারকে বলল,ভাই হাসপাতালে চলেন। ছেলেটি বেঁচে আছে। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান।
হাসপাতাল পৌছে কুহু রাতুলকে ডাক্তাররে কাছে সপে দিল। রাতুলের জ্ঞান না আসা পর্যন্ত কুহু সারাদিন হাসপাতালে বসেছিল। রাতুলের প্রচুর রক্তের প্রয়োজন ছিল। ভাগ্যক্রমে কুহুর রক্ত রাতুলের রক্তের সঙ্গে মিলে গেল। দীর্ঘ সাত ঘন্টা পর রাতুলের জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফিরে কুহুকে দেখে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রাতুল।
রাতুলের সব প্রশ্নের উত্তর দিল কুহু। রাতুল প্রায় একমাস হাসপাতালে ছিল। কুহু প্রায় রাতুলকে দেখতে আসে। সেবা যত্ন করে। রাতুলের প্রতি অন্য রকম একটা টান অনুভব করে কুহু। যে টান সে আগের বাসায় কবর দিয়ে এসেছিল। রাতুলও কুহুর ভিতরে তার প্রতি ভালবাসার এক পসলা বৃষ্টি উঁকি মেরে দেখে ফেলেছিল। রাতুল জেনে গেছে কুহুর রক্ত তার শরীরে বইছে। রাতুল যেদিন হাসপাতাল থেকে চলে যাবে সেদিন কুহুকে বলল, আমার নাম্বারটা রাখো। প্লীজ একটু দেখা করো।
কুহু রাতুলকে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে এল। অনেক ভেবে চিন্তে কুহু সিদ্ধান্ত নিলো দেখা করবে রাতুলের সঙ্গে। কুহু খুব অস্থির মন নিয়ে ফোন করল রাতুলকে।
রাতুল কুহুর ফোন পেয়ে উচ্ছসতি হয়ে বলল, কাল সকালে শিশু পার্কে এসো। কথা আছে অনেক।
রাতে কুহুর সারারাত ঘুম হল না। শুধু ফারিহার কথা ভাবছে সে । ফিরে গেল কুহু সেই আগের স্মৃতিতে। রাতুলের জীবন থেকে ফারিহার চ্যাপ্টার মুছে গেল কিভাবে? ফারিহা কিভাবে হার মানল? ফারিহার এখন কি অবস্থা ? এমন অনেক প্রশ্ন তাকে চিন্তায় ফেলে দিল । অবশেষে কিছুক্ষণ পায়চারি করল। সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সকাল হলো। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে কুহু আয়নার সামনে বসল। বসে ভাবছে তার জীবন যখন গ্লানি আর ক্লান্তিতে ভরে গেছে,যখন সে ভাবছে এই জীবনের নতুন করে আর কিছুই হওয়ার নেই, ঘটার নেই,ঠিক তখনি রাতুলের আবির্ভাব। এক অন্ধকার মুহূর্তে যেনো নতুন আলোর দিশা৷ মনটা এমন কেন৷ ধাক্কা পেয়েও বার বার আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখে। সময় মানুষকে কম আঘাত দেয়না ৷ জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই কুহু ভুলে থাকার চেষ্টা করছে । না ভুললে তো বেঁছে থাকাই অসম্ভব হতো ৷ কিন্তু রাতুলের ব্যাপারটা কি হল? অবশ্য এটা ছিল কুহুর প্রথম প্রেমে পরা ৷ তাই হয়তো এত ভুলে থাকার মাঝেও এই প্রথম প্রেম তার মনে তীর বিদ্ধ হয়ে আছে ৷ যাক এই মুর্হূতে সব চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেকে পরিপাটী করে রওনা দিল পার্কে। পার্কের সামনে রাতুল ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে।
কুহু রিকশা থেকে নামল।
রাতুল ফুলগুলো কুহুকে দিয়ে বলল, ভালবাসার তিনটি গোলাপ তোমার জন্য।
দুজন পার্কে ঢুকল। কুহু ফারিহার কথা জানতে চাইলে রাতুল এড়িয়ে চলে,
বলে,থাকনা ওর কথা। বাচ্চা মেয়ে । শুধু শুধু পাগলামি করতো ।
মানে?
মানে সহজ। ওর সঙ্গে আমার কিছুই ছিল না। ও বুঝতে পারেনি।
কি বলছ তুমি?
হ্যাঁ আমি সত্যি বলছি । ব্যাপারটা এত বড় হয়ে যাবে আমি ভাবিনি ।
কুহু অনেক্ষন চুপ করে রইল। সবকিছু ওর এলোমলেো লাগছে ।কুহু যখন যোগ- বিয়োগ করছে , হঠাৎ রাতুল বলে উঠল চলো বিয়ে করে ফেলি । আজই। আমরা দুজন দুজনের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম। তুমি বিশ্বাস করবে যখন থেকে তুমি বাসা ছেড়ে দিয়েছ তখন থেকে আমি তোমাকে খুঁজছি । খুঁজতে, খুঁজতে যখন তোমার অফিসের ঠিকানা পেয়ে গেলাম, সেদিনই আমার এক্সডিন্টেটা হল ।
কুহু রাতুলের কথা যতয় শুনছে ততয় অবাক হচ্ছে । তাকিয়ে রইল রাতুলের দিকে। কি হচ্ছে এসব । মনে হল তার সকালের তাজা রৌদ্রের আলো নতুন করে ধ্বংসের আবহ তৈরী করছে রাতুলের কথায়।
রাতুল আবার বলল, কুহু জানো সত্যিকারের ভালবাসা এমনি যেখানে দুজনের অনেক ছোটখাট বিষয় গুরুত্ব পায় সমানভাবে, পরস্পরের ভালোলাগাগুলো দুজনকেই দোলা দেয়, মান অভিমানের মাঝেও দুজনের টান আর প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি, তোমার কি মনে হয়নি একবারও এত বছর পর আমি কতটুকু তোমাকে গুরুত্ব দিচ্ছি, কারণ তুমি ছিলে আমার প্রথম প্রেম ও ভালবাসা। একটাবার ভেবে দেখো । আমাকে বোঝ । কথা বলতে বলতে কখন দুজনে পার্ক থেকে বের হয়ে পড়ল টের পেল না।
কুহু কোন কথা বলতে পারল না । কুহু আর হাটতেও পারছিল না। মনে হল তার পা দুটো কেউ বেধে ফেলেছে।
কুহুর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে।
হঠাৎ রাতুলের ধাক্কায় হুশ ফিরলো।
– চলো কুহু, আমরা সামনে হাঁটি।
কুহুর মনে হলো, সে যেন এইমাত্র স্বপ্নের জগত থেকে ফিরে এলো, ঘুম থেকে উঠে দাড়াল।
রাতুল জিজ্ঞেস করলো, কি হলো কুহু এত ঘামছ কেন ? কি ভাবছ?
কুহু বলল, কিছু না। জীবনের চার অধ্যায়ের কথা ভাবছি, ভাবছি পরিণতির কথা………….

লেখক পরিচিতি : শাম্মী তুলতুল একজন ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক ।
তার লেখায় থাকে সব সময় এক ধরনের ম্যাসেজ,আছে সমাজ এবং সমাজ সচেতন করার এক প্রকার শক্তি।খুব অল্প বয়সেই তিনি দেশ ও দেশের বাইরে তার লেখনি দিয়ে জয় করছেন অজস্র মানুষের ভালোবাসা।তার জন্ম চট্টগ্রাম শহরেই।তার পরিবারটাও অনেক মজার।একটা সাহিত্য সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক, উচ্চশিক্ষিত,অভিজাত ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে তার বেড়ে ওঠা।পরিবারের সবাইকে একদিকে যেমন দেখেছেন রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করতে অন্যদিকে দেখেছেন সমান তালে সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অংশগ্রহণ করতে। তাই লেখালেখি তার রক্তে মুক্তিযুদ্ধ তার চেতনায়।
পরিবার থেকে অনুপ্রাণিত ও নিজের ইচ্ছাশক্তির বলে ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি।স্বরচিত ছড়া পাঠ করে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন শিশু বয়সেই।
সেই থেকে একযুগের চাইতেও বেশী একযোগে দৈনিক প্রথম আলো,বাংলাদেশ প্রতিদিন,সমকাল, যুগান্তর সহ দেশের বিখ্যাত আঞ্চলিক,জাতীয় দৈনিক ,মাসিক ও দেশের বাইরের ভিবিন্ন পত্র পত্রকায় লিখে শীর্ষে আছেন।
এই পর্যন্ত তার আঁটটি বই বের হয়েছে।তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখিত বই চোরাবালির বাসিন্দা, বাল্য বিবাহের ওপর লিখিত বই পদ্মবু, গণিত মামার চামচ রহস্য, নানটু-ঝানটুর বক্স রহস্য ,পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ তার উল্লখেযোগ্য বই।।
লেখালেখি ও পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম টেলিভিশনে নিয়মিত আবৃত্তি ও চট্টগ্রাম বেতারে অনুষ্ঠান গ্রন্থনা করে থাকেন।তাছাড়া তিনি জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের অ্যাম্বাসেডর ও দেশের দ্বিতীয় মেম্বার অব পার্লামেন্ট জাতীয় যুব সংসদের কেবিনেট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এবারের ২১ শে বই মেলায় তার দুটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। উপন্যাস ”মনজুয়ারি”।একটি অসম্পূর্ণ প্রেম কাহিনী। অভিশপ্ত ভালোবাসার করুণ পরিনতি।এই বইটি বের করছে অনিন্দ্য প্রকাশ, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।
আর একটি শিশু _কিশোরদের বই। ”দৈত্য হবে রাজ”।এটি বের করছে য়ারোয়া প্রকাশনী , প্রচ্ছদ করেছেন সোহাগ পারভেজ।

LEAVE A REPLY