খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানিতে যা বললেন বিচারপতি

0
225

ঢাকা প্রতিনিধি: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে করা জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে মামলার রায়ের নথি উচ্চ আদালতে পৌঁছানোর পর আদেশ দেওয়া হবে।

কারাবন্দি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জামিন হচ্ছে কি না, তা জানার জন্য আজ রোববার দেশের মানুষের মনোযোগ ছিল হাইকোর্টের দিকে।

বিকেলে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শেষে কোনো আদেশ ছাড়াই আদালত কার্যক্রম শেষ করেন।

দুপুর ২টা ১২ মিনিটে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিম বেঞ্চে বসেন। তখন আদালতকক্ষ ছিল আইনজীবীতে পরিপূর্ণ। কোথাও কোনো তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

এ অবস্থায় আদালত দুই পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন,‘আদালত কক্ষ কানায় কানায় আইনজীবী দিয়ে পূর্ণ। এ রকম হলে তো শুনানি করা যাবে না।’

তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘মাননীয় আদালত,এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা।

সারাদেশের মানুষ এ মামলার দিকে তাকিয়ে আছে। আইনজীবীরা কেউ কোনো শব্দ করবেন না।’

আদালত বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে প্রেশার তৈরির একটা চেষ্টা।’

তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘না, না। আইনজীবীরা কেউ কোনো আওয়াজ করবেন না।’

আদালত এই পর্যায়ে বলেন, ‘তাহলে আপনার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা কক্ষে থাকেন। বাকিরা বাইরে চলে যান।’ তখন জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এই জামিনে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল একাই শুনানির ক্ষমতা রাখেন।’ ওই পক্ষের আইনজীবীরাও বাইরে যেতে পারেন।

আদালত তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কক্ষ খালি করুন। আমরা ১০ মিনিট পর এজলাসে বসব।’

এরপর বিচারকরা এজলাস ত্যাগ করে চলে যান। এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আইনজীবীদের কয়েকজনকে বিচারকক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।

পরে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। শুনানির শুরুতে জয়নুল আবেদিন বলেন, এখানে ব্যারিস্টার রফিক উল হক, মওদুদ আহমদসহ সিনিয়র আইনজীবীরা রয়েছেন। এ সময় খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবীদের নাম পড়ে আদালতকে শোনান। পরে বলেন, এ মামলায় শুরুতে শুনানি করবেন এ জে মোহাম্মদ আলী।

শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে তাঁর (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু এ আইনে তাঁকে সাজা দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁকে এ আইনে অভিযুক্ত করা হয়নি। এখানে সংক্ষিপ্ত সাজা দেওয়া হয়েছে। আদালতের রেওয়াজ আছে তিনি জামিন পেতে পারেন। এ ছাড়া তিনি বয়স্ক ও অসুস্থ নারী।

পরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান শুনানিতে আপিল বিভাগের একটি রায়ের নজির তুলে ধরে বলেন, মাদক আইনে এক আসামিকে দুই বছর সাজা দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ সাজার রায় বহাল রাখেন। জামিন দেননি।

এ সময় আদালত বলেন, এটা তো কোনো নজির হতে পারে না। এটার সাথে এ মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। পরে খুরশিদ আলম খান বলেন, সংক্ষিপ্ত সাজায় জামিন পেতে পারেন, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। এ ছাড়া তিনি যে অসুস্থ, সেটার স্বপক্ষে কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি।

এ সময় আদালত বলেন, উনারা মেডিক্যাল সার্টিফিকেট না দিলেও সার্টিফায়েড কপি দিয়েছেন। এতে সবকিছু রয়েছে। বরং আপনি এ বিষয় কোনো যুক্তি দিতে পারেন কি না?

এ সময় খুরশিদ আলম খান বলেন, মাই লর্ড যেকোনো মামলায় জামিন চাইতে হলে অসুস্থ বিবেচনা নিলে অবশ্যই মেডিকেল রিপোর্ট দিতে হবে। ইয়াবা মামলায় আসামি আমিন হুদার মেডিকেল সার্টিফিকেট দেওয়ার পরও জামিন দেওয়া হয়নি। এভাবে অনেক নজির রয়েছে জামিন না দেওয়ার। আমি মনে করি নিম্ন আদালতের নথি আসার পর জামিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়।

এ সময় আদালত বলেন, এ মামলায় তো আসামিকে দুদক আইনে অভিযুক্ত করা হয়নি। সাজাও দেওয়া হয়নি। তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায়।
এ সময় দুদকের আইনজীবী বলেন, আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার ব্যাখ্যা অন্য পৃষ্ঠায় রয়েছে।

জবাবে আদালত বলেন, ‘তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) দুদক মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। আপনারা সেটার বিষয়ে যুক্তিযুক্ত কোনো কিছু দিতে পারেননি। আপনাকে তো প্রথমে অভিযুক্ত করতে হবে। পরে আদালত বলেন, দুটি তো অভিযুক্ত করে একটিতে সাজা দিতে হবে।’ এ সময় দুদক আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, উনি এ মামলায় আজ পর্যন্ত মোট ২০৫ দিন সাজা খেটেছেন। এ সময়ে তাঁর সাজা থেকে বাদ যাবে। এ সংক্ষিপ্ত সময় জেল খাটার পর নথি আসার আগে তাঁকে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না।
এ সময় আদালত বলেন, নথি আসার আগেও দিতে পারি আবার নথি আসার পরও দিতে পারি।

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ইতিহাসে এ প্রথম কোনো মামলা; যেখানে এতিমের টাকা খোয়া গেছে।’

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের স্বাক্ষরে কীভাবে টাকা চলে যায়? ওই সময় তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসায়ই থাকতেন। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এত বড় দায় এড়াতে পারেন না।’ টাকাটা এসেছে, খোয়া গেছে এবং পাঁচটি চেকে এসব টাকা উত্তোলন হয়েছে নথিতে সবই রয়েছে।

এ মামলায় আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হতে পারে।’ মাহবুবে আলম বলেন, ‘২০০৮ সালের মামলা। ২৩৭ কার্যদিবসে তিনি ১০৯ বার বিভিন্ন অজুহাতে সময় নিয়েছেন। এ ছাড়া ২৬ বার উচ্চ আদালতে এসেছেন। চার বার বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। মোট কথা নয় বছরের মতো মামলাটি চলছে। সুতরাং এখানেও দেরি হবে না, তা বলা যায় না। তাই আপিল শুনানির জন্য এক মাসের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুত হতে পারে। যেমন বিডিআর মামলায় হয়েছিল। আমাদের কোর্টের সে প্রযুক্তি আছে।’
এ সময় আদালত বলেন, মামলা বাতিলের আবেদনটি দুই বছরে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ সময় অ্যার্টনি জেনারেল বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও জনতা টাওয়ার মামলায় সাজা হয়েছে। পরে তিনি তিন বছরের বেশি জেল খেটেছেন। উনার সাত বছর সাজা হয়।

জবাবে আদালত বলেন, ‘এসব কথা টিভিতে টক শোর বক্তব্য হতে পারে। মামলার কোনো যুক্তি আছে কি না?’

এ সময় আর্টনি জেনারেল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর একটি বক্তব্যের পত্রিকা কাটিং আদালতে পড়ে শুনিয়ে বলেন, ‘যেখানে বলা হয়েছে, রায় প্রদানকারী বিচারককেও ছাড় দেওয়া হবে না।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘এসব বিষয় আমরা কথা বলব না। কেননা উকিলরা ও রাজনীতিবিদরা সবাই রায় পক্ষে গেলে বলে ঐতিহাসিক রায় আর বিপক্ষে গেলে বলে বিদ্বেষমূলক রায়। আর রাজনীতিবিদরা তো বলে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছুই নেই। সুতরাং রাজনীতি বিষয়ে আমরা কিছু বলব না।’

এ সময় অ্যার্টনি জেনারেল বলেন, সবাই বলেন না। যেমন আমাদের মওদুদ আহমদ সাহেবও আছেন, জয়নুল আবেদীন সাহেবও রয়েছেন। তারা এসব কথা বলবেন না।

এ পর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দুই বিচারক পরামর্শ করে আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, জামিন আবেদনের শুনানি শেষ, নিম্ন আদালতের নথি আসার পর আদেশ।
এর আগে গত সপ্তাহে জামিন ও আপিল গ্রহণের পর আদালত নিম্ন আদালতের নথি ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

খালেদা জিয়ার মামলার নথি নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে এসে পৌঁছেনি। এই নথি হাইকোর্টে পৌঁছানোর পরই এ বিষয়ে আদেশ দেওয়া হবে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জামিন আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আজকের দিন ঠিক করেন। সেইসঙ্গে স্থগিত করেন খালেদা জিয়ার অর্থদণ্ড।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম। খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন বিশেষ আদালত। এ ছাড়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

LEAVE A REPLY