গল্পকার তাপস চক্রবর্তী এর গল্প ‘’ ঈশ্বর ও মুনিয়া‘’

0
108

             ঈশ্বর ও মুনিয়া

                                            তাপস চক্রবর্তী

বড় রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতেই উত্তাল দক্ষিন সমুদ্র। সাগরে দক্ষিন তীরে সবুজ গ্রামের শেষ প্রান্তে উচু পাহাড়। ঘন শ্যামল পাহাড়ের কোল ঘেঁষেই এঁকে বেঁকে চলে গেছে সরু লাল মেঠো পথ। সেই লাল মেঠো পথের কোল ঘেঁষে লজ্জাবতীর আস্তিন।
লজ্জাবতীর সারে সারে হাজার রঙিন প্রজাপতির মিছিল। সেই পথ ধরেই একটু এগিয়ে যেতেই হাজার বছরের একট পোড়া মন্দির ঠিক তার পিছনেই নদী -নদীর নাম চন্দনা।

শাল তমালের পাতায় পোড়া মন্দিরের চুন সুড়কির পরতে পরতে জানান দেয় সভ্যতার ইতিকথা।
বাবার কাছে শুনেছি মন্দির গড়েছেন স্বয়ঙ বিশ্বকর্মা। একপূর্ণ চন্দ্রিমায় অমরা হতে দেবরাজ ইন্দ্র সখি সমেত বেড়াতে আসেন এই মত্ত্যের পাঠশালায় এবং সেই রাতেই বিশ্বকর্মাকে ডেকে এনে মন্দির নির্মাণ।
সকালে হৈ হৈ ব্যাপর জনস্রোত আসে হাজার গুঞ্জন দেবতা ছিলেন আছেন…..সত্য-ত্রেতা কিম্বা তারও আগের ঘটনা প্রবাহ।

আজকাল এই পোড়া মন্দিরে ঈশ্বর থাকেন- নিরবে নিভৃতে। শীত গ্রীষ্মে রোদে বৃষ্টিতে কুয়াশায় এমন কি ধাঙ্গরের শক্তবাহু তলে।

কী আশ্চর্য্য ঈশ্বরের কোন বাছ বিচার নেই!

অনেকেই বলে পূজোর জন্য নাকি ঈশ্বর অপেক্ষা করেন যুগ যুগ…..
ওই সবুজ গ্রাম থেকে রোজ মুনিয়া আসতো কাঠ কুড়াতে….মন্দির মাড়িয়ে ওপাশে যেতেই একটা ভারী কন্ঠ ভেসে আসতো – কে যাও?
মুনিয়া কহে – আমি গো ঠাকুর।
ঈশ্বর কহিত – ও তুই!
তারপর নিরব নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোলে কেবলি ভেসে আসতো ঝিঁ ঝিঁর কলতান।
নদীর জলে হাটু ডুবিয়ে ঈশ্বর নাকি দুবেলা জল কেলি করেন পথিকের সাথে!
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রেনের শেষ ধ্বণি শুনতে ভালো লাগতো ঈশ্বরের কিম্বা দূরে সমুদ্র তার অঘাত জলরাশি তাকে টানতো ভীষন ভাবে।
সেই কবে এই পাহাড়ের-শাল পাতার ভাঁজে আশ্রয় মিলেছিল তার ইয়াত্তা কেউ রাখেনি।
তবুও মনে পড়ে যুদ্ধের কথা-যেবার এই মুল্লকে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সেইবার ঈশ্বরের বাপ মাও গেছে স্বর্গে। তারপর থেকে এই সবুজ পাহাড়ে। ঈশ্বরের বেড়ে ওঠা। নীচে নামতে প্রচন্ড ভয় করে ঈশ্বর। মুনিয়ারও কেউ নেই। ঠাকুরমার কোলে পিঠে মানুষ। সোমত্ত মেয়ে মানুষ ক্ষিধের জ্বালায় রোজ একা একা পাহাড়ে আসতো। আবান কাঠ কুড়িয়ে বিকেলে ফিরে যেতো শেষ বিকেলের মেয়ে হয়ে মুনিয়া।
গত ফালগুনে রোহিত হাতে পড়ে কতোবারই যে গতর বাড়িয়েছে তার কোন ইয়াত্তা নেই -বার বার শুধুই স্বপ্ন দেখেছে। এখন রোহিত নেই পাহাড়ে এলে একলা লাগে মুনিয়ার।
মুনিয়ার সাথে পথ চলতে চলতে ঈশ্বরের ভাব হয়েছিল গত বর্ষায়।
এখন বসন্ত। বনফুলের ভিড়ে ভিড়ে হাজার ভ্রমর উড়ে
মাঝে মাঝে হেসে মুনিয়া কহে ও ঠাকুর নদীটির নাম ক্যান এমন হলো?
ঈশ্বর হেসে কহিত – মুনিয়া তোর পাখির নামে নাম। তুই ক্যান পাখি হলি না?
মুনিয়া কহিত – দেখো ঠাকুর মুই একদিন সত্যিকারে পাখি হবো সেদিন আর নাগাল পাবে না ঠাকুর
ঈশ্বর কহিত – সে তো এখনও পাচ্ছি না,,,কবে পাবো জানি না।
মুনিয়া কহিত – তুমি ঠাকুর বেশ আছো,,,,মোরে মোর নদীর কথা কহ,,,,,,
ঈশ্বর হাসিয়া কহিত -নদী!
চন্দনা নামের ইতিহাস কেউ জানে না। এমন কি আমার বাপ ঠাকুরদ্দারও কাছে কখন শুনিনি।
তবে আমাদের গাঁয়ের নামটি বেশ খাসা হয়তো এও বলবেন সাহিত্যের খাতিরে বড় বেশি বলা। হ্যাঁ আমাদের গ্রামটি বড় বাড়িয়ে বলা ঠিক নদীটির মতো -প্রিয়ঙবদা। হ্যাঁ গাঁয়ের নাম প্রিয়ঙবদা।
প্রিয় ভাষিণীর গাঁয়ে যে এক্কেবার সবাই সাধুসন্ত কিম্বা ধোঁয়া তুলসীর পাতা এই কথা বলবার সাহস আমার নেই।
চন্দনার স্বচ্ছ জলে হাঁটু ডুবিয়ে রোজ কাঠ কুঁড়িয়ে আনতো মুনিয়া। তারপর বাজারে হাজার পূরুষের ভিড়ে -উৎকট সংলাপ।
সবুজ গাঁয়ের জোতদার রহমান। নব্য পয়সাওয়ালা। বিদেশ করে করে আজ ধরা কে সরা জ্ঞান করতে নারাজ। তারি ছেলে রহিম মুনিয়াকে অনেকবার ত্যাক্ত বিরক্ত করেছে -বাজারে হাজার লোকের সামনে থুতু ছিটিয়ে মজা লুটে নিয়েছে -ওড়না টান দিয়ে বুকের দৈর্ঘ্য দেখেছে বেজন্মার মতো।

শ্রাবণ ফিরে গেছে সপ্তা দুই আগে। এখন ভাদ্রের মাঝামাঝি সময় সারে সারে কদম ফুটে হলদে হয়ে উঠেছে সবুজপাতা। দাঁড়কাকের বাচ্চাগুলো উড়তে শিখছে-হয়তো আর দুই একদিন পরে ওরা আকাশ ছুঁয়ে বলবে-আমি বড় হয়েছি।
বড় হতে হতে যেমন আমরা ছুঁয়েছি চাঁদ মঙ্গল কিম্বা জীবন

পিয়ালের মগডালে হুতোম পেঁচার ক্রন্দনে জানান দিচ্ছে আকাশের বিরূপ অবস্থার।
মেঘের ঘন ঘটা। পাহাড়ের শেষ প্রান্তের সেই সবুজ গ্রামের আলো নিবু নিবু করছে।
রাত্তি গহিন। চুপচাপ ধরনীতল। মেঘলা চাঁদের আলোয় উদবাসিত বনভূমি। শাল পাতারা আছন্ন নিদ্রায়। পোড়া মন্দির এবং অধিষ্টিত দেবতাও বেসামাল।
একটা বিদঘুটে কান্নার কোলাহলে ঘুম ভেঙে যায় ঈশ্বরের।
আদো আদো স্বর ভাঙা কণ্ঠে কহিল -কে?
ওই প্রান্ত থেকে ভেসে আসে -আমি। বলে হু হু করে শ্রাবণের ধারা বিলাপে যেন টুংরি তালে তাল ঠেকে মহাকাল।
হতচকিয়ে উঠে ঈশ্বর। বুকের কোণের ব্যথাটা চিনচিনিয়ে উঠে। দোর খুলেই বলে এতো রাতে তুই! কি হয়েছে? কানছিস ক্যান?
মুনিয়া কহে -বাড়িখান দখল করলো জোতদার। ওরা ভিটে বাড়ি দখল করে ক্ষান্ত নয়। জোতদারের জোয়ান মরদ মোর গতরের উৎকট স্বাদ চায় -ঠাকুর কহ এবে মোর কি হবে? যা ছিল একদা চেটেপুটে নিয়েছে আর আইজ!
ঈশ্বরের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হয়। কেন জানি না সমুদ্রের ফুসে ওঠা তরঙ যেমন সব শেষ করবার শপথ নেয় তেমন করে শাল পাতার ভাঁজ থেকে খড়্গটা হাতে নেয়।
কালবৈশাখীর রুদ্রবীণায় যেমন মহাকাল নাচে ঠিক তেমন ঈশ্বরের দুচোখে নামে অগ্নি
ঈশ্বরের মনে পড়ে যুদ্ধের কথা। বাপের হাতে অস্ত্র ছিলনা বটে কিন্তু এই খড়্গ দিয়ে পাকসেনার দোসর রহমত আলী খন্ডিত মুন্ড”

লেখক পরিচিতি : নাট্যকার, গল্পকার ও কবি

LEAVE A REPLY