জামায়াতকে ছাড়াই পথ চলতে প্রস্তুত বিএনপি!

0
28

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক:‌ ২০ দলীয় জোটের প্রধান দুই শরিক বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সুসম্পর্কের ফাটল দিন দিন চওড়া হচ্ছে। আগের কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াতের দরকষাকষি এবং দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নিষ্ক্রিয় থাকায় অসন্তুষ্ট বিএনপি। জোটের প্রধান দুই শরিকের মধ্যে টানাপড়েন এবার স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাকর্মীরা। এর মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য জাতীয় ঐক্যের একমাত্র ‘বাধা’ হিসেবে বিবেচিত জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব শুরু হলো।

বিএনপির শীর্ষনেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, পরিবর্তিত পরিস্থতিতে জামায়াত এখন বিএনপি’র বোঝা। বরং নিবন্ধন ও প্রতীক হারানোর পর বিএনপির কাঁধে সাওয়ার হয়েই জামায়াতকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষনেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর বিএনপির নিরবতা থেকেই মূলত দুইদলের মধ্যে সুসম্পর্কে ফাটল ধরে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর দুই দশকের রাজনৈতিক জোট ও ভোটবন্ধু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব আরো বেড়েছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে ২০ দলীয় জোটের অনেক নেতাই নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। তবে জামায়াতের কোনো নেতাকে দেখা যাচ্ছে না। খালেদার মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। বিএনপি এখন জামায়াতের কর্মকাণ্ড সন্দেহের চোখে দেখছে। দলীয় নেতার সন্দেহ করছেন,জামায়াতের বড় একটি অংশের সঙ্গে সরকারের গোপন সম্পর্ক আছে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে,মূলত গ্রেপ্তার আতঙ্কের কারণেই এসব কর্মসূচিতে দলটির নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারছেন না। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা খেয়াল করছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব রয়েছে। বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের ঐক্য ছিল না।আগামী ৩০ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে মেয়র প্রার্থিতা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দলের দ্বৈরথ স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। এ নির্বাচনে জামায়াত আলাদাভাবে মেয়র প্রার্থী দিয়েছে। নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় বর্তমানে জামায়াত দলীয় প্রতীকে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। স্বতন্ত্র ব্যানারে দলটির নেতারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনেও একই কৌশলে লড়তে পারে জামায়াত। এক্ষেত্রে জোটের ভেতরে আসন নিয়ে এরইমধ্যে দরকষাকষি শুরু হয়েছে।

সিলেট সিটি নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণাকে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী ঘোষণাকে বিএনপির নেতারা ‘বাড়াবাড়ি’ বলে মনে করছেন। বিষয়টি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত।এ অবস্থায় জামায়াত জোট ছেড়ে গেলে বিএনপি লাভবান হবে বলে তারা মনে করছেন।

সিলেটে জামায়াতের প্রার্থিতা বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, জামায়াত বাড়াবাড়ি করছে। তারা যা করছে তা ঐক্য বোঝায় না, ঐক্য থাকে না। ঐক্য ভাঙার দায়িত্ব জামায়াত নিতে পারে, তারা তা করতেই পারে। ২০০৮ সালে জামায়াতের চাপে নির্বাচনে যেতে হয়েছিল, তার ফল এখনো ভোগ করতে হচ্ছে বিএনপিকে।

মির্জা আব্বাস ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, যখন দেশ থেকে একটি বোঝা দূর করতে আন্দোলন চলছে, সেখানে নতুন সমস্যা তৈরি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য বলেন, জামায়াত নিয়ে অনেক হয়েছে; ওরা যদি যেতে চায় চলে যাক। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক থাকুক- এটা প্রতিবেশি দেশসহ পশ্চিমা দেশগুলোও চায় না। কারণ, ভারতের ধারণা; এটা পাকিস্তানপন্থি দল। সম্প্রতি ভারত সফরকালে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তাব্যক্তিদের সফরেও জামায়াতের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।

সিলেটে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আরিফুল হককে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় জামায়াত তাদের সিলেট জেলা আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে প্রার্থী ঘোষণা দেয়। নির্বাচনের মাঠে তিনি সক্রিয় আছেন এখন পর্যন্ত। এ বিষয়ে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে কোন সমঝোতায় আসেনি জামায়াত। তারা তাদের মেয়র প্রার্থী এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে অপারগতা জানানোর পর এ নিয়ে দুই দলই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে।

সিলেট নির্বাচন নিয়ে জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুল হালিম এক বিবৃতিতে বলেন, সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রয়েছেন। এতে বিভ্রান্তির কোনও অবকাশ নেই। দলের মেয়র প্রাথির্ী এহসানুল মাহবুবও জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে থাকবেন। তার প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ নেই। এতে জোটের ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ৫টি আসন দুই জোটের জন্য উন্মুক্ত ছিল। তখনও সমস্যা হয়নি। এটি পারস্পরিক বোঝাপাড়ার বিষয়। আর মূলত জোট হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের জন্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নয়।

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, অন্যসব সিটির মতোই সিলেটেও জোটের প্রার্থী একজনই থাকছেন। এ নিয়ে জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্তও হয়েছে। ওই বৈঠকে উপস্থিতজামায়াতের নেতা মাওলানা আবদুল হালিমও বলেছেন, আমি জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে আপনাদের মতামত জানাবো। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। আর সময় তো আছেই। কিন্ত বৈঠক থেকে বেরিয়ে গিয়ে তারা ভিন্ন কথা বলছেন।

তিনি বলেন, জোটের শরিক দলগুলোর বাকি সবাই বলেছে, সিলেটে বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীই মোর পুপলার। সেখানে তিনি আগেও মেয়র ছিলেন। অথচ জামায়াত সেটা মানছে না। দেখা যাক কি হয়। এখনই চুড়ান্ত কিছু বলার সময় হয়নি।

বছর দুয়েক আগে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়েও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনকেন্দ্রিক ঝামেলা তীব্র হয়। এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত মাঠে না থাকায় ক্ষুব্ধ ছিল নেতাকর্মীরা।

বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য, দেশ ও দেশের রাজনীতি একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ। এই সময়ে জামায়াত নানা ইস্যুকে সামনে এনে তারা সেই ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

দলটির নেতাদের ধারণা, ‘সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক’ তৈরি করে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থায় রাখতেই জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এসব করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের মতামতে জামায়াতকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। ওই সময়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নেতারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই নির্বাচনে জয়লাভ করে জামায়াতের আমির রাজাকার মতিউর রহমান চৌধুরী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রী বানানো হয়। এ নিয়ে বিএনপিকে ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

বিএনপিতে এখন বলাবলি হচ্ছে, দেশে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামায়াত-ই বড় বাধা। সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াত জোট ছাড়তে চাইলে তাদের ‘ধরে’ রাখতে কোনো চেষ্টা করবে না বিএনপি। জামায়াত ছাড়া অন্য শরিক দলের মত একই রকম।
সূত্র পূর্ব পশ্চিম বিডি নিউজ

LEAVE A REPLY