তারুণ্যের কবি ও লেখক লাকি কোড়াইয়া এর ভিন্ন মাত্রার হদয় মর্মের স্মৃতি নিয়ে জীবনধর্মী গল্প ” অনুভুতিতে তুমি ”

0
222
তারুণ্যের কবি ও লেখক লাকি কোড়াইয়া

অনুভুতিতে তুমি

                             লাকি কোড়াইয়া

স্মৃতিতে তুমি এমন ভাবে জড়িয়ে থাকবে সেটা সেদিন বুঝতে পারি নি।বুঝতেই পারিনি যেই তোমার জন্য আজ আমার বাম হাতের উপড় দিদির হাতের বেতটা শপাং শব্দে বেজেছে,সেই তুমি আমার কত কাছের হয়ে উঠবে একদিন।বুঝিনি যেই তুমি আমার সাথে পাঁচটি বছর একসাথে চলেছো,সেই তুমি একদিন আমাকে কাঁদিয়ে বিজয়ের হাসি নিয়ে চলে যাবে আমার ভুবণ থেকে,এই চিরসুন্দর মায়ারপৃথিবী থেকে,মায়ার বাধঁন ছিন্ন করে।আমার বড্ড মনে পড়ে সেইদিনের কথা,কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তুমি ক্লাসের সামনে এসে দাঁড়ালে।সম্ভবতঃমালতি দিদির অনুমতি নিয়ে তুমি ক্লাসে প্রবেশ করেছিলে।ক্লাসের ভিতরে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মত তিমি এদিক -ওদিক তাকাচ্ছিলে। আমি একটু সরে গিয়ে তোমায় বসতে দিলাম।সেদিন বুঝিনি তোমায় শুধু পাশেই বসতে দেয়নি,বসিয়েছি আমার হৃদয় কুটিরে!আমার তো আর তর সইছিল না,তাই দিদি চলে যাবার সাথে সাথেই নিজের পরিচয় টা দিয়ে তোমার নামটা জানতে চাইলাম।তুমি অত্যন্ত শান্ত আর নম্র ভাবে উত্তর দিলে,আমি শারমিন সাথি।আমি বলেছিলাম,তোমাকে সাথি বলেই ডাকব।তুমি ঘাড় বাঁ দিকে কাৎ করে হ্যা সূচক সম্মতি দিয়েছিলে।বুঝেছিলাম তুমি কম কথা বল!কষ্ট পেয়েছিলাম।আহারে,আমার নতুন বান্ধবী সে তো কথাই বলে না।কিন্তু ধৈর্য হারাইনি।পরদিন স্কুলে গিয়ে তোমার জন্য জায়গা রেখেছি।তুমি এলে।বসলে আমার পাশে।দু’তিনদিন যাওয়ার পর বুঝলাম তুমি তো সাধারণ কেউ নও।পড়াশুনাতে সবার উপড়ে! ক্লাসের সকল পড়া তোমার মুখস্থ। সব উত্তর ই তুমি দিচ্ছ। আমার মাথা চড়কগাছেরর মত ঘুরে গেল!যে কি-না কথা বলে না,অনেকে ইতি মধ্যে যাকে বোবা ভাবতে শুরু করেছে,সে কি-না এত্ত পারে?আর আমি??তার বিপরীত! তবে এটা কোন বিষয় নয়।তাই তোমার সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম। এরই মধ্যে একদিন ইতিহাস ক্লাসে তুমি যখন পড়া মুখস্থ দিচ্ছিলে,আমি হেসেছিলাম তোমার ভাষাগত একটু সমস্যার জন্য।তুমি একটু টেনে টেনে পড়া দিচ্ছিলে।আর সাথে সাথেই শেফালি দিদি আমার বাঁ হাতের আংগুলে যত্ন করে বেত বসিয়ে দিলেন।

তোমার সাথে আমার অন্তরঙ্গতা বাড়তে লাগল।তুমি ও আমাকে ছাড়া কারো সাথে মিশতে না।এদিকে আমার আগের বান্ধবীরা কেমন কেমন করতেই লাগল।কানে তুলিনি। একদিন স্কুলে অনুষ্ঠানে তুমি নাম দিলে গান গাইবে বলে।প্র্যাকটিস চলাকালে তোমার গান শুনে সেইদিন যেন তোমাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিলাম!মানুষের গানের স্বর এত্ত মধুর হয় কি করে!তোমাকে আরো বেশি ভাল লাগতে লাগল।

কেননা আমি যে গান বড্ড বেশি ভালবাসি।এর পর থেকে তোমার বান্ধবীর সংখ্যা বাড়তে লাগল।শিউলি,নাসরিন,তাজনাহার,ফারজানা,আরো অনেক!!!

কিভাবে আমাদের এই বন্ধুত্ব গড়িয়ে আমাদের পরিবার ও যোগ হল আমাদের সাথে।প্রথম যেদিন তুমি আমাদের বাড়িতে এসেছিলে,সেদিন আংকেল আমাকে আর তোমাকে সামনে এনে আমার বাবাকে বলেছিলেন, দাদা,এতদিন আমার ছিল এক মেয়ে দুই ছেলে,আজ হল দুই মেয়ে আর চার ছেলে। বড়দিন ইষ্টার সান -ডে তুমি এলে বড্ড ভাল লাগত।স্কুলে যখন তখনই তোমাকে গান শোনাতে বলতাম।আর তুমি আপন মনে গান শুনাতে।স্কুলের অনুষ্ঠানে তোমার মুখে প্রথম শুনেছিলাম,”আকাশে সূর্য আছে যতদিন,তুমি কো আমারই আর কারো নও….”তুমি গেয়েছিলে “সাদা কাফনে আমাকে জড়াতে পারবে,মাটির কবরে শোয়াতে পারবে,মন থেকে আমার স্মৃতি ভুলতে পারবে না…”তোমার গান শুনে শুনে গানকে আরো বেশি ভালবেসে ফেলেছিলাম আর ভেবেেছিলাম গানেরশিল্পী বিয়ে করব!!!!নবীন বরণ অনুষ্ঠানে তুমি তোমার নিজের লেখা ও সুর করা একটি গান গেয়েছিলে।”নবীন বরণের দিনে,আমি গেয়ে যাব তোমাদেরই গান”।এভাবে গান গেয়ে আর তোমার মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে তুমি যে কত মানুষের মন জ করেছ তা তুমি জানো নি।স্কুলে বরাবরই তুমি প্রথম হয়েছ,কিন্তু এ নিয়ে তুমি কখনো অহংকার করন।তুমি জর্জ হতে চেয়েছিলে।আমি একদিন মজা করে বলেছিলাম,সাথি তুমি যখন জর্জ হবে,তখন তো তোমার সাথে দেখা করার সুযোগ পাবো না।তাই বিনা কারণে কারো মাথা ফাটিয়ে জেলে যাবো আর আদালতে তোমার সাথে দেখা করব।শুনে তুমি খুব হেসেছিলে।এসএসসি পরীক্ষা দিলাম।আমাদের রাস্তা বদলে গেল।আমি এলাম ঢাকা আর তোমার সাথে দেখা হয়নি।মোবাইলের যুগ তো আর ছিল না কথা ও হয়নি।অন্যের মাধ্যমে এ খবর পেতাম।সময় পার হতে লাগল।আমি তখন ডিগ্রি ফাইনাল দিব।আমার ভাতিজা অলড্রিন একদিন ঢাকা এসে আমাকে জানালো,সাথি নামের আমার এক বান্ধবী নাকি মারা গেছে!আমি বিশ্বাস করিনি।এটা কিভাবে সম্ভব? আমি খোঁজ নিলাম।জীবনে প্রথম আমার পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল।মুখের ভাষা যেন স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। সত্যিটা মেনে নেওয়ার মত ক্ষমতা হয়ত সেদিন ঈশ্বর আমায় দেননি। কতদিন কেঁদেছি মনে নেই এখন।ছুটে গিয়েছিলাম সাথির বাড়ীতে।শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম একমাত্র মেয়ে হারানো অসহায় বাবা-মায়ের বুবা কান্না!!!সেই ঘর,সেই বিছানা,দেওয়াল ভর্তি সাথির নানা ছবি যেগুলো আংকেল নিজ হাতে তুলেছিলেন, সব কিছুই আছে,শুধু সাথি নেই। ডিসেম্বর মাসে বাড়ি এসে সব বান্ধুবীদের নিয়ে একসাথে আনন্দ করবে বলে নিয়ে পছন্ করে কিনেছিল মেলামাইনের থালা।প্যাকেট খুলতে বারণ করেছিল তাই সেটা আর খোলা হয়নি। আমি নির্বাক হয়ে দেখছিলাম সব।

আসার সময় সাথির কবর টা দুর থেকে দেখলাম! যা কখনো ভাবিনি সেটা কিভাবে এত নির্মম ভাবে ধরা দিল?

হিসাব মিলাতে পারিনি।পারবো না কোনদিন।বাড়ি ফেরার পথে অ্যান্টির কথা গুলো বার বার কানে বাজতে লাগল,আল্লাহ্‌ আমার মেয়েটাকে এইভাবে নিয়ে গেল? সাথির অসুখের খবর পেয়েই আমরা চিটাগাং চলে যাই।আমরা যখন হাসপাতালে পৌঁছাই, আমার আম্মুর জানটা তখন প্রায় যায় যায়।আমরা সাথিকে ডাকতেই ওর চোখ জোড়া কেঁপে ওঠল।একটু তাকালো।মুখ একটু “হা”করল।আমি পাশে বসে ওর মাথাটা কোলে তুলে নিলাম।আমি একটু পানি দিলাম।তারপর…….আমার আম্মু আর চোখ খুলেনি।!!!!!আমি আজো সেই কথাগুলো ভুলতে পারিনা। শত কাজ,শত ব্যস্ততা,শত প্রিয় মুখ,সব কিছুর পর ও সাথির স্মৃতির কাছে বিলীন হয়ে যায়।সবার মধ্যে থেকে ও সাথিকে খুব মনে পড়ে!!!!! সাথির সেদিনের গানের কথাগুলো ই আজ সত্যি হয়ে উঠল,“সাদা কাফনে আমাকে জড়াতে পারবে,মাটির কবরে শোয়াতে পারবে,মন থেকে আমার স্মৃতি ভুলতে পারবে না…..আমাকে ভুলতে পারবে না…..

LEAVE A REPLY