তারুণ্যের কবি ও লেখক শামসুন নাহার এর জীবনছোঁয়া অসাধারণ ছোট গল্প ‘’ শেষ প্রহরের প্রণয় ’’

0
37
তারুণ্যের কবি ও লেখক শামসুন নাহার

শেষ প্রহরের প্রণয়

                             —————-
    শামসুন নাহার

                                                   ————-

অবিনাষ শয্যাশায়ী।মৃত্যু পথযাত্রী কিনা তা ইশ্বরই জানেন, তবে আত্নীয় স্বজন ওর তেমন নেই বললেই চলে,একমাত্র ছেলে এবং তার পরিবার দুরে থাকে। স্ত্রী কাছে থেকেও ভিন্নগ্রহের মানুষ,দুজনার কথাবার্তা খুব একটা হয়না,আর গত কয়েকদিন ধরে খুব সামান্যই দেখা হয়।ঠিক যতটুকু প্রয়োজন তার বেশী নয়।

ছটফট করছে অবিনাষ,বারবার দরজার পানে তাকিয়ে থাকছে, হয়তো কারো আসার প্রতিক্ষায়।বাতাসের একটু শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে,সত্যি বুঝি কারো পায়ের ধ্বনি শোনা যায়?

ট্রেনটা আজ এমনিতেই লেট, তারপরও নৈহাটি থেকে শিয়ালদহ এরপর ট্যাক্সি করে যেতে হবে আরো কিছু পথ তারপর মেটিয়াব্রুজ। এখানেই অবিনাষ থাকে। আজ কারো অপেক্ষায় হয়তো বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টায় অনিমিলীত আঁখিতে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আজ আসতেই হবে তাকে, ওর মন ডেকে বলছে।

মাধবীলতা ট্রেন থেকে নেমে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সির দিকে।পরনে গরদের লালপেঁড়ে শাড়ী,সিঁথিতে সিঁদুর নেই,কপালে বড় একটা লাল টিপ।গলায় সাদা মুক্তার ছোট দানার একটা মালা। চোখের চশমাটাতে ভারী লেন্স। কানে দুটো স্বর্ণের ফুল, যেন বকুল শোভা পাচ্ছে।

ট্যাক্সি থেকে নেমে সিড়ি ভেংগে দোতলার পশ্চিম পাশের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো মাধবী লতা। আস্তে আস্তে ডাক দিল অবি–
অনিমিলীত চোখ দুটোতেও বিদু্ৎ এর চমক বয়ে গেল, মাধু, মাধবী লতা ক্ষীণকন্ঠে বেরিয়ে এলো ” তুমি এসেছো”?
একপা দু’পা করে এগিয়ে এলো, লতার ইচ্ছা করছে যা যৌবনে হয়নি আজ ও সে কাজটাই করবে অবিনাষ কে বুকে জড়িয়ে ধরে সমস্ত পৃথিবী পাঁড়ি দিয়ে ও পৌছে যাবে স্বর্গের দোরগোড়ায়।মাথাটা ঝিমঝিম করছে, অবিনাষের ভুলের জন্য আজ ওর ঠিকানা আালাদা, শুধু ঠিকানা বদলের দিনেই অবিনাষ, মাধবীকে বলেছিলো — আর কি দেখা হবেনা এ জীবনে? মাধবী কথা দিয়েছিলো যেদিন খুব প্রয়োজন হবে, সেদিন আমি আসবো।

মাধবীর ছেলে ডাক্তার, যেদিন মেটিয়াব্রুজ সরকারী হাসপাতালে জয়েন করে, সেদিনই মাধবী ছেলেকে বলে রাখে ওখানে তোমার মামা আছে খোঁজ নিও।
আজ এত বছর পর মাধবীর ছেলে খবর পাঠিয়েছে মাকে, “মা মামা অসুস্থ্য,দেখতে চাইলে এসো”।অবিনাষ তার চিকিৎসাধীন রুগী।

অবিনাষের বিয়ের কয়েক বছর পর তার স্ত্রী স্নেহলতা জানতে পারে ওদের প্রণয়ের কথা, জানতে পারে মাধবী ছাড়া অবিনাষ আর কাউকেই ভালবাসে না। তখন সবেমাত্র তার একটা ছেলে বয়স বছর দুয়েক হবে,এরপর থেকে সে সরে গেছে অবিনাষের জীবন থেকে,শুধু প্রয়োজনে দুজনের যতটুকু কথা হয়।বন্ধন বলতে কিছুই নেই,শুধুই সমাজ সামাজিকতা।

হঠাৎ কথার শব্দ শুনে দরজায় এসে দাঁড়ায় স্নেহলতা,পিছন থেকে দেখেই বুঝে নেয় এ সেই মাধবীলতা।ধীরকন্ঠে ডাক দেয় দিদি! কিছুটা চমকে যেয়েও থমকে যায় মাধবী, পিছনে তাকিয়ে বুঝে নেয়,এ অবিনাশেষের স্ত্রী।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চায় কিছু বলবে? এগিয়ে আসে স্নেহলতা, মাধবীর হাতটা ধরে অবিনাষের হাতের উপর দিয়ে বলে, দিদি শুধু তোমার জন্যই যে আমার এ সংসারে থাকা।আজ তুমি এলে আমি দায়মুক্ত, তোমার অবি তোমারই আছে।

মাধবীর কন্ঠে কথা নাই, নয়নে শ্রাবণের ধারা,অবিনাষ শুয়ে আছে দুচোখ বন্ধ করে। গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু চোয়াল থেকে কান বেয়ে।
তখন গোধূলী লগ্ন।

LEAVE A REPLY