তারুণ্যের গল্পকার ও কবি জয়তী রায় এর সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী ইচ্ছে অনুভূতির গল্প * বেশ্যা *

0
112
তারুণ্যের গল্পকার ও কবি জয়তী রায়

                            * বেশ্যা *

                                                               জয়তী রায়

‘ওগো ও বাবু যাবে নাকি?’ চোখের ঈশারাতে একটা নির্লজ্জ্ব ইঙ্গিত করে উঠল, আলো আঁধারী ল্যাম্প পোস্টের তলায় দাঁড়ানো মেয়েটা। তার এই কথা ও ইঙ্গিত শুনে প্রত্যেকেই একটা ঘৃণার চোখে একবার হলেও তাকাচ্ছে মেয়েটার দিকে। এক ঝলক দৃষ্টিপাত করলে খেয়াল করা যায় পড়নে তার টকটকে লাল রঙের একটা ঝলমলে সিন্থেটিক শাড়ি আর তার সঙ্গে মানানসই একটা সবুজ রঙের ব্লাউজ। হাতে কটা লাল-সবুজ কাঁচের চুরি আর চুলে একটা খোঁপা,যাতে কানের পাশে গোঁজা লাল গোলাপ। সস্তার পাউডার ঘষে মুখটা সাদা ধবধবে,যেন দেখে মনে হয় একটা মৃত মুখ।আর লাল লিপস্টিকে রাঙানো ঠোঁট,দেখে মনে হয় শরীরের সবটুকু রক্ত যেন ওখানে এসেই জমা হয়েছে।
আজ দুদিন হয়ে গেল ,বর্ষার ঘরে উনুন ধরে নি।ছেলেটা খিদেতে মাঝে মাঝেই কেঁদে উঠছে।দুটি ভাত, ফেন সহ কাল এনেছিল পাশের ঘরের বিন্তির কাছ থেকে।বিন্তির বেশ সময় চলছে।প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসে ওর ঘরে।দিয়ে যায় ওর খাদ্যের রসদ।তাছাড়া বিন্তিটা একা থাকে।কেউ নেই ওর।তাই বর্ষার ছেলেটাকে বড্ড ভালোবাসে বিন্তি।খিদেতে অনেক কাঁদলে বিন্তিই কাল বর্ষাকে ফেন ভাত নিয়ে যেতে বলে।বর্ষা যেন হাতে স্বর্গ পেল। ভেবে পাচ্ছিল না কি করে ছেলেটার মুখে দুটো খাবার তুলে দেবে।
তিন বছর আগের একটা অভিশপ্ত দিন,যেদিনটা ছিল বর্ষার জীবনে তখন আনন্দের দিন।কারণ সেই দিনটাতেই সুরেশের হাত ধরে বর্ষা কলকাতা শহরের বুকে পা ফেলে।সুরেশ মিশ্র, রাজমিস্তিরির কাজ করতে এসেছিল বর্ষাদের গ্রামে,ওদের গ্রামের স্কুল-বাড়ির কাজের সময়।স্কুল বাড়ির পাশের বড় কুয়োটা ছিল গ্রামে সবার খাবার জলের যোগান।গ্রামের সবাই সেখান থেকে খাবার জল নিতো।প্রত্যেকের মতো বর্ষাও খাবার জল আনত যেত ওখানে।মনে আছে বর্ষার, এমনই এক দিনে প্রতিদিনের মতো জল আনতে গেলে, কুয়োর বালতিতে জল তুলে ঘড়াতে ঢালতে ঢালতে বর্ষা শুনতে পেল কথাটা -‘ আমাকে একটু জল দেবে বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।’ঘুরে তাকাতেই বর্ষা সুরেশকে দেখতে পায়।মুখে কিছু না বলে ঘুরে বর্ষা বালতির জল ঢেলে দেয় সুরেশের বাড়ানো হাতের উপর।জল খেয়ে সুরেশ একবার ভালো ভাবে বর্ষার দিকে তাকিয়ে হাসলো।বর্ষা ঘুরে আবার জল ভরতে লাগে।এরপর থেকেই প্রতিদিন বর্ষা যখনই জল আনতে যেত,সুরেশ জল খাবার নাম করে আসতো কুয়োর পারে।আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে একটা ভালোবাসার সম্পর্কে।শেষে যখন স্কুল বাড়ির কাজ শেষ হলো, সুরেশের ফিরে যাবার সময় হলো বর্ষা তখন ভাবতেই পারে না সুরেশকে ছাড়া তার জীবন।দুজনে ঠিক করে গ্রামের শেষে মন্দিরে বিয়ে করে সুরেশ নিয়ে যাবে বর্ষাকে তার স্বপ্নের শহর কলকাতাতে।যেখানে সুরেশ থাকে তার বাকি পরিবার পরিজনের সঙ্গে। সরল বিশ্বাসে বর্ষা সুরেশের কথা মত শেষ রাতে বের হয়ে আসে বাড়ি থেকে সঙ্গে সম্বল মায়ের কানের ঝুমকো জোড়া আর গোটা আড়াইশো টা টাকা।
মন্দিরে বিয়ে করে সুরেশ নিয়ে আসে বর্ষাকে কলকাতায়।এনে তোলে তার মাসির বাড়ি।যেখানে সে মাসির কাছে রেখে ‘তুমি থাকো, না বলে এসেছি তো বাইরে থেকে আজ রাতের খাবারটা নিয়ে আসি,’ বলে সুরেশ চলে যায়। সেই যে যায় বর্ষা আর কোনো দিন সুরেশকে দেখেনি।পরে জেনেছে বর্ষা সুরেশ ১৫০০ টাকাতে তাকে বিক্রি করে দিয়ে গেছে শ্যামা মাসির কাছে। প্রথমে চেষ্টা করেছিল বর্ষা পালাতে,পারেনি।পরে বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয় এই বেশ্যা বৃত্তি করতে।তা করতে ওই ছেলেটা এলো পেটে। সব খারাপের মাঝে ওই যেন তার বাঁচার পাথেয়।হাজার বার মরার কথা ভাবলেও পারে নি বর্ষা মরতে,ছেলেটার মুখ মনে পড়ে যায়। আজ বর্ষা বেশ্যা। সন্ধ্যে বেলা প্রতিদিন মুখে সস্তার রঙ মেখে দাঁড়ায় নিজের দেহ বেচতে,বেচে ও।পুরুষ সমাজ যাকে দেখে ঘৃণায় চোখ ফেরায়,তারাই ল্যাম্প পোস্টের আড়ালে অন্ধকারে তাকে টেনে নিয়ে যায় নিজের লালসা মেটাতে।প্রথম মরেছিল বর্ষা সেদিন,যেদিন সুরেশ তাকে বেচে দিয়ে গিয়েছিল ১৫০০ হাজার টাকায় মাসির কাছে।তারপর প্রতিরাতে মরছে সে।তাও সে বেঁচে ওঠে প্রতিদিন তার ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে।এযে বড় মায়া ….. মনে মনে বলে ‘ আমি ছাড়া তো আর ওর কেউ নেই, আমি যে তার মা।’

LEAVE A REPLY