মো: সরওয়ারুজ্জামান এর বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা ”কোন গন্তব্যে বাংলাদেশ?”

0
467

কোন গন্তব্যে বাংলাদেশ?

মো: সরওয়ারুজ্জামান

গতকাল ১৯/২/১৮ তারিখ পত্রিকায় দেখলাম আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের দলীয় এক মত বিনিময় সভায় বলেছেন,” আমরা বেগম খালেদা জিয়া বিহীন বিএনপির সাথে আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে চাই।”কথাটি বলার পিছনে অন্তর্নিহীত কারন বা যুক্তি যাই থাক, আসলে কথাটির মাধ্যমে জনগনের কাছে কি বার্তা গেছে তা অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়।সাধারন নাগরিক হিসাবে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে বন্দি খালেদা জিয়া এক দুর্দান্ত, ভয়ংকর এবং অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে যা ক্ষমতাসিন দলের জন্য শুধু চ্যালেঞ্জই নয় রীতিমত অপ্রতিরোধ্যও বটে।আমি কথাটা শুধু কথার কথা নয় আবার সেতু মন্ত্রী মহোদয়ের কথাকে হেয়ালিও করি নাই বরং চলমান রাজনীতির বাস্তবতা পর্যবেক্ষন এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষন থেকেই বলেছি। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া আসার পথে নেতা কর্মী সহ সাধারন জনগন তার গাড়ী বহরে যুক্ত হয়ে তার প্রতি যে ভাবে সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে তা অবশ্যই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক মহলকে আতংকিত করেছে।শুধু তাই নয়, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষনার দিন চুড়ান্ত হবার পরে ”আমার নেত্রী আমার মা, জেলে যেতে দিব না” এবং সাজা হবার পরে “আমার নেত্রী আমার মা বন্দি থাকতে দেব না” যে নতুন স্লোগানের জন্ম হয়েছে তা সর্বস্তরের মানুষের হ্দয়ের স্পন্দনকেই যেন নাড়া দিচ্ছে।এই স্লোগান শুধু রাজধানী বা বিভাগীয় শহর নয় মফস্বল শহর সহ গ্রামে গঞ্জে নারীপুরুষ আবালবৃদ্ধাবনিতার কন্ঠে যে ভাবে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা যেন অতীতের অনেক জনপ্রিয় স্লোগানের ন্যায় ইতিহাসের অংশ হতে চলেছে।বেগম খালেদা জিয়ার মামলার বিষয় বস্ত সত্য মিথ্যা কিংবা মাননীয় আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সাজা প্রদানের বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নাই। আমার আলোচ্য বিষয় সমগ্র প্রক্রিয়াকে জনগন কি ভাবে দেখছে। এ দেশের জনগন স্বাধীনচেতা এবং গনতন্ত্র প্রিয়।রক্তস্নাত স্বাধীনতা যুদ্ধে এ দেশের মানুষ গনতন্ত্র, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার এই চেতনা বুকে নিয়ে অংশ গ্রহন করেছিল কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও সেই চেতনার নুন্যতম বাস্তবায়ন হয়েছে তা বলার সুযোগ নাই। তারপরেও এ দেশের মানুষ গনতন্ত্র নামের সোনার হরিনের জন্য অদ্যাবধি নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছে।সুস্থ্য গনতন্ত্র অনুশীলনের জন্য রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহারয্য। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর “ আগে উন্নয়ন পরে গনতন্ত্র” তত্বের আওতায় সীমিত গনতন্ত্র অনুশীলনের নামে রাজনীতির মাঠ থেকে বিরোধী দলকে বিতাড়িত করা, জনগনের রক্তে অর্জিত তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ, ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং নির্বাচনের আগে পরের ঘটনা জনগনকে বিক্ষব্ধ করেছে । বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়াকে বিভিন্ন ভাবে অবরুদ্ধ রাখা এবং বিএনপির নেতৃত্বের ২০ দলীয় জোটকে নুন্যতম রাজনৈতিক কর্মসুচী পালন করতে না দেওয়ায় তাদের প্রতি জনগনের সমর্থন বেড়েছে। তবে সেটা বিশ দলীয় জোটের প্রতি না হলেও মাঠে বিরোধী দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জনপ্রত্যাশার কারনেও হতে পারে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে পরের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকান্ড যা কিনা একে অপরখে দোষারোপ করে থাকে, সেই রকম একটা ঘটনার পরেও রেগম খালেদা জিয়া কোন রাজনৈতিক কর্মসুচীতে উপস্থিত হলেই সেখানে জনস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে।সর্বোপরি মামলার সাজা হওয়ার ঘটনাকে জনগন ভিন্ন আঙ্গিকেরই মনে করছে। যেহেতু শাষক দলের কাধে ৫ই জানুয়ারীর একটি ঘটনার দায় আছে সেহেতু জাতীয় নির্বাচনের পুর্বে বেগম খালেদা জিয়ার কারাদন্ড আর একটি ৫ জানুয়ারীর পুর্ব প্রস্তুতি হিসাবে ধারনা করাটা অমুলক হবে না। এদিকে বিএনপিও তাদের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ এবং কর্মসুচী গ্রহন করছে এবং কর্মসুচী সমুহে নেতা কর্মি সহ ব্যাপক জনগনের অংশ গ্রহন লক্ষনীয় হারে বাড়ছে। বিএনপির সাংগাঠনিক দুবর্লতা এবং অর্ন্তদ্বন্দের কারনে ইতি পুর্বে জাতীয় বা আঞ্চলিক কর্মসুচীতে যে সহিংস ঘটনা লক্ষ্য করা যেত, বর্তমান কর্মসুচী সমুহে তা একেবারেই অনুপস্থিত। আমার বিশ্বাস বিএনপি এ অহিংস কর্মসুচীর ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখতে পারলে খুব নিকট ভবিষ্যতে জনসমর্থনপুষ্ট এবং সুসংগঠিত প্লাটফর্মে দাড়িঁয়ে যাবে যা শাসক দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিতে পারে । আবার শাষক দলও এই প্রক্রিয়াকে কোন ভাবে বাধাগ্রস্থ করলে তাও হীতে বিপরীত বা বুমেরাং হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা রয়েছে । শাষক দলের নেতৃবৃন্দের অনেককেই বলতে শুনি যে বিএনপির যে দুর্বল সাংগাঠনিক অবকাঠামো তাতে তাদের পক্ষে কোন গনআন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রেও আমার ভিন্নমত এই কারনে যে ৫২ সালের রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন সহ বিশ্বের অনেক দেশের সফল আন্দোলনের উদাহরন আছে যা রাজনৈতিক নেতৃত্বে না হয়ে জনগনের মধ্য থেকে গড়ে উঠা নেতৃত্ব দিয়ে সুসম্পন্ন এবং সফল হয়েছে। তাই বাংলাদেশের মানুষ যদি বর্তমান অবস্থায় নিজেদের অবরুদ্ধ মনে করে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থা প্রবর্তনের আন্দোলন শুরু করে এবং সে আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হলেও জনগন তাদের মধ্য থেকে গড়ে উঠা নেতার নেতৃত্বে আন্দোলন সফল করতে পারে। সুতরাং সাধু সাবধান।
লেখক:- কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

LEAVE A REPLY