মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস এর বিশ্লেষণ ধর্মী পর্যালোচনা লেখা ” উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি” পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সফলতা

0
433
মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

” উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি”
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সফলতা

                                                          মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

স্বাধীনতার এই মাসে দেশটির আর একটি অর্জন নিয়ে আলোচনা শুরু করার পুর্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দানকারী অকুেতাভয় বীর সেনানীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।বাংলাদেশটি কিন্তু স্বাধীন হয়েছিল শুন্য কপর্দক নিয়ে, তার উপরে প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা,জাতীয় ঐক্যমত্যের অভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা. আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, খাদ্যাভাব, কিছু কিছু মানুষের স্বার্থসিদ্ধির অশুভ পাঁয়তারা সবকিছু মিলিয়ে তৎকালিন ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব সদ্য স্বাধীন দেশটিকে কাংখিত লক্ষমাত্রার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার একটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।তাছাড়া জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে শিশু রাষ্ট্রটির অগ্রগতি, উন্নয়ন আরো বেশী ঝুকিপুর্ন হবে চিন্তা করে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কালের সরকার পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কর্মসুচীর সফল বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অধীন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ সৃষ্টি করে একটি অর্গানগ্রামের মাধ্যমে প্রতিটা ওয়ার্ডে পরিবার কল্যান সহকারী পদবীতে একজন মহিলা কর্মি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের কাজে সহযোগিতা, পরিদর্শন এবং সমন্বয় করার জন্য পরিবার পরিকল্পনা সহকারী (বর্তমান পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক) পদবীতে একজন পুরুষ কর্মী নিযোগ দেন। আমি এই পদে ১৯৭৮ সালে ৪ঠা মে যোগদান করেছিলাম। কর্মসুচীটিকে জনপ্রিয় এবং আরও কার্যকর করার জন্য কর্মসুচীর পরিধী বৃদ্ধি করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা যুক্ত করে তৃনমুল পর্যায়ে সেবাদান নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র নির্মান করেন যা প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মসুচী বাস্তবায়নের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিনত হয়।তৎকালিন সময়ে অশিক্ষিত, অসচেতন জনগোষ্ঠি, গ্রাম্য প্রধান বা মাতব্বর এবং তথাকথিত ধর্মান্ধ আলেম সমাজের কর্মসুচী বিরোধী ফতোয়া প্রদান, নানাবিধ লাঞ্চনা, গঞ্জনা, অপমান অপদস্ত সহ্য করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মাঠ কর্মচারীগন কর্মসুচীর সফল বাস্তবায়ন এবং কাংখিত লক্ষমাত্রার দ্বারপ্রান্তে পৌছিয়েছে।হাজারো অপপ্রচার সত্বেও কাজের অগ্রগতি দ্বারা প্রমান করেছে তারা মাঠে কাজ করেছেন।কর্মসুচীর সফল বাস্তবায়নের কারনেই ১৯৮৬ সালে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ সাহেবের একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ মাঠের কাজের স্বীকৃতি এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমুর্তিকে উজ্ঝল করেছিল।পরবর্তীকালে মাও শিশু মৃত্যু হার হ্রাস করে এম ডি জি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার কারনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে যে এম ডি জি পুরস্কার লাভ করেছিলেন, সে সফলতারও সিংহভাগ দাবিদার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মচারীগন।শুধু তাই নয় গত ১৭ মার্চ্চ/২০১৮ তারিখে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করে যে স্বীকৃতি বা সনদ প্রদান করা হোয়েছে সে অর্জনের মুলেও রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রয়ন কর্মসুচীর সফল বাস্তবায়ন। যদিও এই অর্জনের পিছনে মধ্যম এবং বৃহৎ শিল্পকারখানা সমুহ কে জাতীয়করনের কর্মসুচী থেকে বেরিয়ে বিজাতীয়করন করা, কারও সংগে শত্রুতা নয় সকলের সংগে বন্ধুত্ব এই নীতিমালার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্র নীতির অনুসরন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার র্অথনীতিতে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশে দেশী বিদেশী শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যংক বীমা সহ ক্ষুদ্র , মাঝারি এবং বৃহৎ বা ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উৎসাহ প্রদান, দেশের ব্যাপক জনগোষ্টিকে শিক্ষিত করে তোলা, বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মক্ষেত্রে নারীর শ্রম বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদিও সহায়ক বটে।তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমুহে জনশক্তি রফতানী , উন্নত বিশ্বে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে অর্থ প্রেরন,দেশে তৈরী পোশাক সহ পাট, চা ,চামড়া রফতানীর অর্থ এ দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। এতদসত্বেও বস্তুত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন সম্ভব না হলে কোন উন্নয়ন বা অগ্রগতি কিছু’ই দৃশ্যমান হত না। ১৯৭১ সালে পুর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার কোটি। স্বাধীনতার ছয়চল্লিশ বছর পর পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কর্মসুচীর সফল বাস্তবায়নের কারনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ষোল কোটি।অন্যদিকে পাকিস্থানের জনসংখ্যা তেইশ কোটি হওয়ার কারনে সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা, আইন শৃংখলা পরিস্থিতি, জঙ্গীবাদ, উন্নয়ন, অগ্রগতি সর্বোপরি বিশ্বে তাদের অবস্থান ইত্যাদি বিশ্লেষন পুর্বক বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলেই পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের সুফলের চিত্র পরিস্কার পাওয়া যায়।বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে প্রাপ্ত পুরস্কার বা মর্যাদা যাই প্রাপ্ত হয়েছে তার অধিকাংশই এসেছে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠ কর্মচারীদের ত্যাগ তিতিক্ষা আর কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা অর্জিত সফলতার কারনে। এ কথা বলা হয়ত বেশী হবে না যে বিশ্বে বাংলাদেশ শুধু উন্ন্য়নের রোল মডেল নয়, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসুচী বাস্তবায়নেরও রোল মডেল বটে । বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারনে দেশ ব্যাপি যে আনন্দ, উল্লাস আর উচ্ছাস তার সংগে আমিও আনন্দিত উল্লাসিত এবং গর্বিত।আনন্দ, উল্লাস প্রকাশের শুভ ক্ষনে এই অর্জনের পিছনে যাদের সবচেয়ে বেশী অবদান বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অবহেলিত , উপেক্ষিত এবং নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত মাঠ কর্মচারীদের যে ত্যাগ তিতিক্ষা এবং কঠিন পরিশ্রম রয়েছে তাদের দীর্ঘ চল্লিশ বছরের কর্মযজ্ঞকে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি।এই গৌরবময় অর্জনের কারনে তাদের যথাযথ মুল্যায়ন, জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা, সামাজিক মান মর্যাদা এবং উ›নততর ভবিষ্যতের জন্য পরবর্তী উচ্চতর স্কেল সহ পদোন্নতির প্রাপ্তি তাদের এখন ন্যায়সঙ্গত অধিকাওে পরিনত হয়েছে। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধান মন্ত্রি, অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহোদয়গনের সুদৃষ্টি কামনা করছি। আমাদের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে প্রথম দিকে নিয়োগকৃত কর্মচারীদের চাকরী উন্নয়ন খাত হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর এবং তা যোগদানের তারিখ থেকে গননা হবে মর্মে ১৯৯৬ সালের রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ এবং মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা সুপ্রিম কোর্টের এ্যাপিলেট ডিভিশনে বহাল থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না । এ কারনে অবসর প্রাপ্ত কর্মচারীগন তাদের পাওনা যথাসময়ে না পাওয়ার কারনে মানবেতর জীবন যাপন করছে অন্যদিকে অনেককেই তাদের ন্যায্য পাওনা না পেয়েই অনেক দু:খকষ্ট সহ্য করে মৃত্যুবরন্ করতে হয়েছে।এই সমস্ত সমস্যা সমাধান এবং প্রত্যাশা পুরন আজকে বাংলাদেশ সরকারের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্যের অর্šÍভুৃক্ত হয়েছে।বিভাগীয় মাঠ কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রিয় নেতৃত্বের কর্ম কৌশল নির্ধারনের দক্ষতা বা বিজ্ঞতার অভাব, আপোষকামিতা এবং সুবিধাব্দাী চরিত্রের কারনে চাকরীরত অবস্থায় অধিদপ্তর বা মন্ত্রনালয়ের সংগে দর কষাকষি কিংবা আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলে এই সমস্ত ন্যায়সঙ্গত অধিকার বা দাবী আদায় বা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নাই। দীর্ঘদিনের মাঠের কাজের অজ্ঞিতার আলোকে বাংলাদেশে মাতৃ এবং শিশু মৃত্যু এবং মোট প্রজনন হার হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিও হার ০ (শুন্যে) আনার জন্য আমার কিছু সুপারিশ সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি আর্কষন এবং সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি । ১/ বাংলাদেশে সকল ক্ষেত্রেই উন্নয়ন দৃশ্যমান, বিশেষ করে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতার স্তর বৃদ্ধি ইত্যাদি।১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এ বিভাগে অষ্টম শ্রেনী ও এস এস সি পাশ পরিবার কল্যান সহকারী এবং এইচ এস সি পাশ পরিবার পরিকল্পনা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল যাদের দ্বারা বর্তমান শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠিকে উদ্বুদ্ধ করে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহনের আওতায় আনা অসম্ভব সেইহেতু তাদেরকে উপর্যপরি প্রশিক্ষন দিয়ে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে মাঠের উদ্বুদ্ধকরন কাজে লাগাতে হবে। অন্যদিকে বর্তমান নিয়োগবিধির পরিবর্তন করে অবসরজনিত কারনে শুন্য পদে উচ্চতর শিক্ষিত মাঠ কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ২/ মাঠ কর্মচারীদের বিরাজমান হতাশা দুর করা অর্থ্যাৎ সদ্য অবসর প্রাপ্ত কর্মচারীগনের রাজস্ব অন্তর্ভুুিক্তর তারিখ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দুর করে তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের ব্যাবস্থা করা এবং বিভাগীয় মাঠ কর্মিদের সংগে একই ধরনের মাঠের কাজ করা স্বাস্থ্য বিভাগীয় মাঠ কর্মচারীদের যে বেতন বৈষম্য রয়েছে তা দুর করে তাদের পদোন্নতি কিংবা পরবর্তী উচ্চতর স্কেল প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান করা। ৩/ দীর্ঘ দিনের মাঠের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে আমার ধারনা, কোন দিনই শিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে স্থায়ী পদ্ধতির আওতায় ( পুরুষ অথবা মহিলা) খুব একটা আনা যায় নাই অর্থাৎ গ্রহনকারীর হার খুবই কম।তাই বর্তমান শিক্ষিত জনগোষ্টিকে স্থায়ী পদ্ধতির আওতায় এনে কর্মসুচী সফল করা যাবে বলে মনে হয় না বিধায় কর্মসুচীর সফলতার স্বার্থে নীতি নির্ধারকগনের বিকল্প বিষয় চিন্তা করা দরকার। ৪/মাঠের কাজে দ্বীতিয় এব¦ং তৃতীয় সারির সুপারভাইজার গনের মান্ধাত্মা আমলের শাস্তির জন্য পরিদর্শন ( পদ্ধতি পরিহার করে সহায়ক বা সহযোগিতা মুলক পরিদর্শন কার্যকর করা দরকার যাতে মাঠ কর্মীগন ভয় ভীতি বা আতংকগ্রস্থ না থেকে আত্মবিশ্বাসের সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে পারে আবার কোন সময় উর্দ্ধতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে মাঠের কাজ বেগবান হয়।
আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এ দেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসুচী সফল হয়েছে বলেই দেশের উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি হয়েছে এবং তা দৃশ্যমান হচ্ছে।সুতরাং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসুচীর সফলতার ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের উন্নয়নও তরানি¦ত হবে,টেকসই হবে এবং জনগন তার সুফল ভোগ করে জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন করবে ইনশে আল্লাহ।
লেখক:রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট

LEAVE A REPLY