মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস এর বিশ্লেষণ ধর্মী পর্যালোচনা লেখা ” গনতন্ত্রের আধারে, বিকলাঙ্গ গনতন্ত্র”

0
524
কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

” গনতন্ত্রের আধারে, বিকলাঙ্গ গনতন্ত্র । ”
                                   মোঃ সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

আমি গনতন্ত্রের আধার বলতে মহান সংসদকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কারন ওয়েষ্ট মিনিষ্টার গনতন্ত্রে দেশের সকল র্কমকান্ডের কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে সংসদ । উন্নত গনতান্ত্রিক বিশ্বে সাংসদগন যে কোন বিষয়ে অর্থ্যাৎ সংবিধানের সংশোধনী সহ অন্যান্য বিলে তাদের চিন্তাপ্রসুত এবং বিবেকের বিচার দিয়ে তা আলোচনা এবং পক্ষে বিপক্ষে ভোট দেবার ক্ষমতা রাখেন। যদিও কোন কোন দেশের সংবিধানে তার ব্যাত্যয়ও আছে। বাংলাদেশের বাস্তবতাটা সম্পুর্ন ব্যাতিক্রম । দেশের প্রচলিত সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের অন্তভুর্ক্তির কারনে সাংসদগনের নৈতিক এবং মৌলিক অনেক অধিকারই ক্ষুন্ন করা হোয়েছে । সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে যা আছে, তা হল, কোন সাংসদ কোন দলের মনোনয়নে বা টিকিটে নির্বাচিত হলে সেই সাংসদ সেই দলের সংসদীয় দলের গৃহিত সিদ্ধান্তের সাথে ভিন্নমত পোষন করতে পারবে না । সেই দল কর্তৃক সংসদে উত্থাপিত কোন সংশোধনী, বিল বা অর্থ বিলের বিরুদ্ধে ভোটদিলে, ভোটদানে বিরত থাকলে কিংবা ভোটের দিনে অনুপস্থিত থাকলে,অন্যদিকে দল তাকে কোন কারনে বহিস্কার করলে, সাংসদ দলের কোন কর্মকান্ডে অসন্তোষ্ট হয়ে পদত্যাগ করলেও তার সংসদীয় আসন শুন্য বলে বিবেচিত হবে । শুধু তাই নয় স্বতনÍ্র সাংসদও কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেন তবে তার উপরেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে । অথচ প্রাশ্চাত্য গনতন্ত্রে বা সংসদীয় গণতন্ত্রে সব ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে থাকে এবং তারাই সরকারকে নিয়ন্ত্রন করে থাকে । কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারনে সাংসদ গন সরকারের উপরে কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না , উ্পরন্ত সরকারই সংসদীয় দলের মাধ্যমে সাংসদদের নিয়ন্ত্রন করে থাকেন । বিধায় বাংলাদেশের সাংসদগন নিজেদের চিন্তা চেতনা বা নির্বাচনী এলাকার জনগনের যে ধ্যান ধারনা লালন করে থাকেন , তার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে অথবা নিজের বিবেক অনুসারে সংসদে ভোট দেওয়ার সুযোগ নাই । এতে করে তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আবার ভাবমুর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে । আর এই নিয়ন্ত্রিত বা স্বকীয় বৈশিষ্ট নিয়ে বিচরন করতে না পারার গনতন্ত্রকেই আমি বিকলাঙ্গ গনতন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছি ।কিছ ুদিন পুর্বে সংসদ সদস্যদের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দিয়ে সংবিধানের যে সংশোধনী আনা হয়ে ছিল , তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিটপিটিশন মহামান্য হাইকোর্ট খারিজ করে দেন । সেই রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট যা বলেছেন, তার সারমর্ম হল , অভিশংসন একটি বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারক গন নিজেদের বিবেকের নির্দেশ অনুসারে কাজ করবেন, অন্য কারও নির্দেশে নয় । বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সাংসদগন দলের নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য । কাজেই বিচারকদের অভিশংসনের দায়িত¦ সংসদ সদস্যদের নিরপেক্ষ এবং বিবেক প্রসুত নির্দেশনা দ্বারা পালন করা সম্ভব নয় বিধায় এ ধরনের সংশোধনীর কোন আইনগত মর্যাদা নাই । যদিও সরকার পক্ষের এ রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের কৃত আপিল সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন তথাপিও বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানের দুর্বলতা মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক চিহ্নিত হয়েছে । আসলে বাংলাদেশে প্রায় তিন দশক ধরে একই ব্যাক্তি দলীয় প্রধান এবং সরকার প্রধান হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছেন । সরকার প্রধান হিসাবে সংবিধান প্রদত্তক্ষমতাবলে তিনি নির্বাহী বিভাগের প্রধান এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করেন বিধায় তাঁর পক্ষে খুব সহজেই দলের মাধ্যমে সংসদ সদস্যগনকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব এবং তা তিনি করে থাকেন । সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সাংসদগন কোন অবস্থাতেই রাষ্টের সমর্থন পান না । কাজেই রাষ্টের সমর্থনের জন্য সংসদ সদস্য গনের এমনিতেই নির্ব্বাহী বিভাগের মুখাপেক্ষী থাকতে হয় , তার উপরে দলের নিয়ন্ত্রন নির্ব্বাহী বিভাগের কুক্ষিগত থাকার কারনে সংসদ সদস্যগন কোন ভাবেই সরকারের উপর নিয়ন্ত্রন রাখতে পারেন না ।এসব কারনে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় , সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি কোন ভাবেই গনতন্ত্রের সৌন্দর্যকে লালন করে না এবং সুস্থ গনতন্ত্র চর্”ার সহায়কও নয়। গনতন্ত্র, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে স্ব্ধাীনকৃত দেশের সংবিধানে এ ধরনের একটি অনুচ্ছেদ সংযোজনের পিছনে অবশ্য কিছ ুঐতিহাসিক ঘটনাও ক্রিয়া করেছে ।
উন্নত গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ সদস্যগন দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হলেও তাদেরকে দলের ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহার করা হত না বা হয়না ।ফলে সংসদ সদস্যগনকে দলের আজ্ঞাবহ হিসাবে পরিগনিত হতে হত না এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বিচার বিশ্লেষন এবং বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়েই ভোট দিতে পারতেন । কিন্তু উন্নয়নশীল অনেক দেশেই এই ব্যাবস্থার অপব্যাবহার হতে থাকে । সংসদ সদস্যগন নগদ অর্থ অথবা অন্য কোন সুযোগ সুবিধার লোভে সাধারন বিল এবং অর্থ বিল তো বটেই, সরকার পরিবর্তনের জন্যেও তারা তাদের ভোট বিক্রয় শুরু করেন। এতে সরকারের স্থিতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হতে থাকে । জনশ্রুতি আছে সাবেক পুর্ব পাকিস্তানেও সংসদ সদস্যরা এ ধরনের একটি মানসিকতা নিয়ে সংসদ ভবনেই স্পিকার শাহেদ আলীকে হত্যা করে । এর ফলে সংসদ সদস্যগনের অধিকার খর্ব করার প্রশ্ন উঠে । সেই স্পিকার শাহেদ আলী হত্যার ঘটনা আমলে নিয়ে বা স্মরন রেখেই বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের সংযোজন হয় । আমার প্রশ্ন মাথা ব্যাথা করলে মাথা কেটে ফেলানোই কি তার সমাধান । নিশ্চয়ই নয় । সুতরাং শাহেদ আলীর ঘটনাকে ভিত্তি করে গনতন্ত্রকে সংকুচিত করা বা কলংকিত করা যেমন যথাযথ নয় , তেমনি সরকারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়াও কাম্য নয় । বর্তমান বিকশিত বিশ্বে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলার জন্য অর্থাৎ উভয় কুল ঠিক রেখে মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করা দরকার । তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্মুল্যায়ন বা নতুন আঙ্গিকে সাজানো এখন সময়ের দাবীতে পরিনত হয়েছে । এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর কয়েকটি দেশের সংবিধানে যে ভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে, তা অনুসরন করা যেতে পারে । যেমন (১) প্রধানমন্ত্রীনির্বাচন , (২) আস্থা অনাস্থা ভোট, (৩) অর্থ বিল ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিল এই তিনটা বিষয়ের পক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংসদদের বাধ্যবাধকতা রেখে বাকী বিষয়গুলি তাদের ব্যাক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টি ভঙ্গি, চিন্তাÑ চেতনা এবং বিবেকের বিচারের উপর ছেড়ে দেওয় াউচিত। একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা বিনির্মানের জন্যই বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আত্মবলিদানের বিািনময়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল । কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬বছর পেরিয়ে যাবার পরেও কি দেশটি তার গন্তব্যে পৌছিয়েছে , এ দেশে গনতন্ত্র কি দৃঢ় ভিত্তির উপরে মেরুদন্ড সোজা করে দাড়িয়েছে । নিশ্চয়ই না । এর দায়ভার সামরিকতন্ত্র বা রাজনৈতিক দলতন্ত্র কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না । কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না , গনতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়ার জন্য আপনারা খোলা মনে কাজ করেছেন । অথচ একটা দেশে সুস্থ গনতন্ত্রের চর্চা ছাড়া সে দেশের রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যাবস্থায় আইনের শাসন বা সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা । বাংলাদেশটিই যার প্রকৃষ্ট উদাহরন । তাই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের জনগন প্রত্যাশা করছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহনকারী সকল রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে এবং তা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রদান করবেন । এতে দেশের জনগন তাদের কাংখিত গনতন্ত্রকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে ভোট প্রদানে উৎসাহিত হবেন ।
লেখক ঃ- রাজনৈতিকবিশ্লেষক ও কলামিষ্ট ।

LEAVE A REPLY