মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস এর বিশ্লেষণ ধর্মী সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে লেখা ”বাংলাদেশের শাসনব্যাবস্থার বৈশিষ্ট ও করনীয় ?? ”

0
220
মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

বাংলাদেশের শাসনব্যাবস্থার বৈশিষ্ট ও করনীয় ??

                                                          মোঃ সরওয়ারুজ্জামান মনাবিশ্বাস

বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং র্দাশনিক প্লুটো তার লিখিত ”দ্য রি-পাবলিক” গ্রন্থে চার ধরনের সংবিধানের কথা উল্লেখ করেছেন । ১/ গোষ্টি শাসন অর্থ্যাৎ সামরিক অভিজাততন্ত্র , ২/ টাইমোক্রাসি অর্থ্যাৎ বিত্তশালীদের শাসন , ৩/ গণতন্ত্র জনগনের শাসন ৪/ পীড়ণমুলক যাকে একজন স্বৈরশাসকের শাসন বোঝায় । আমার প্রশ্ন বাংলাদেশের সংবিধান , রাষ্ট্র বা শাসনব্যাবস্থা উপরোক্ত সাংবিধানিক বৈশিষ্টের কোনটির অন্তর্ভুক্ত নাকি নতুন কোন চরিত্রের বা বৈশিষ্টের ।
দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসনে শোষনে জর্জরিত এ দেশের মানুষ একটি সোনালী ভবিষ্যতের আকাংখায় বহু ত্যাগ তিতিক্ষা আর ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তের ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। পাকিস্থান সেনাবহিনীর মত একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীকে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পরাজিত করে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন যেমন এ ভুখন্ডের মানুষের রাষ্ট্রনৈতিক লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অতুলনীয় এবং অনন্য ঘটনা তেমনি স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় একটি সংবিধান কার্যকর করাও ছিল নিঃসন্দেহে একটি বিস্ময় । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি ঘোষনাপত্র ছিল । সে ঘোষনায় ’ গণতন্ত্র , সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার ছিল । রচিত সংবিধানে সেই সমস্ত অঙ্গিকারের কতটুকু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং তা কার্যকর করার জন্য সংবিধানে কতটুকু ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে তা আলোচনার দাবী রাখে । বাংলাদেশের প্রচলিত সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রজাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় মুলনীতি এই তিনটি অধ্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে এবং তৎপুর্বে এ দেশের মানুষ যে সমস্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছিল, তা অনেকাংশেই প্রতিফলিত হয়েছে । কিন্তু সংবিধানের ৪র্থ অধ্যায়সহ অবশিষ্ট অংশে যেখানে ক্ষমতার বন্টন করা হয়েছে, তা এতটাই ’ এক ব্যাক্তি কেন্দ্রিক ’ যা কোন ভাবেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না । সংবিধানের বৈশিষ্ট অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ব্যাতিরেকে রাষ্ট্রের সকল কিছুই সংবিধানের অধীন । প্রধানমন্ত্রী শুধু সংবিধানের উর্দ্ধেই নয় এমন কি সকল প্রকার জবাবদিহিতারও উর্দ্ধে বরং বলা যায় সংবিধানই তাঁর ইচ্ছাধীন । অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারনে যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনি যদি দলীয় প্রধান হন এবং সংসদে যদি দলটির দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা থাকে তাহলে তিনি নিরুঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং সে ক্ষমতা প্রয়োগে কোনরুপ বাধা বিঘেœর কোন কারন নাই । যে সংবিধানে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা একজনের কাছে কেন্দ্রিভুত থাকে সে সংবিধান গণতান্ত্রিক , স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র বা স্বাধীনতার চেতনার সংগে সামঞ্জস্যপুর্ন তা বলা যায় না । এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না , যে অগনতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ যে দীর্ঘ লড়াই Ñ সংগ্রাম করেছে তাতে তারা সফলতা অর্জন করতে পারেনি , শুধু অর্জন করেছে গনতন্ত্রের চেহারার একটি অগনতান্ত্রিক সংবিধান ।
ইদানিং রাজনীতির মাঠে ” সীমিত গনতন্ত্র ” এবং ”আগে উন্নয়ন পরে গনতন্ত্র” এ ধরনের কিছু তত্বের কথা শোনা যায় । কোন গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের মুখে এ ধরনের তত্ব আমার মনে হয় জনমনে রীতিমত বিস্ময়েরই সৃষ্টি করেছে । কারন পৃথিবীতে অনেক দৃষ্টান্তই আছে যেখানে রাজতন্ত্র , একনায়কতন্ত্র , পরিবারতন্ত্র , সমাজতন্ত্র , ফ্যাসিবাদ , সামরিকতন্ত্র এমন কি স্বৈরতন্ত্রের অধীনেও অনেক দেশেই উন্নয়ন, উন্নতি হয়েছে আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হয়েছে । কিন্তু সে সমস্ত দেশে শ্রেনী বৈষম্য কমিয়ে এনে কতটুক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেছে তা কিন্তু এখন গবেষনার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। অনেকেই মালয়েশিয়ার উদাহরন দিয়ে থাকেন , আমিও সেই উদাহরন টেনে বলতে চাই , এ ধরনের গণতন্ত্রহীনতার চর্চার কারনে মাহাতির মোহাম্মদ তারঁ দীর্ঘ দিনের রাজনিৈতক সহকর্মী আনোয়ার ইব্রাহিমকে একটা ন্যাক্কারজনক অভিযোগে দীর্ঘ দিন কারারুদ্ধ রেখেছিলেন। মাহাথীর মোহাম্মদের উত্তরসুরী নাজিব রেজাকের শাসনামলে ঘুষ-দুর্নীতি , সামাজিক অবক্ষয় এক কথায় অপরাজনীতি এবং অপশাসনের যে ভয়াবহ চিত্র, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না । কিন্তু গনতন্ত্রের চর্চাকে সমুন্নত রেখে যদি আনোয়ার ইব্রাহিমকে বিরোধী দলীয় নেতার ভুমিকা পালন করার সুযোগ দেওয়া হত তাহলে মালয়েশিয়ার চিত্র ভিন্ন হতে পারত । এ ধরনের একটা ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়েই মালয়ীদের উদ্ধার করতে মাহাতীর মোহাম্মদকেই গনতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে কারারুদ্ধ আনোয়ার ইব্রাহিমের গনতন্ত্রের ট্রেনে চাপতে হোয়েছে । গত ২৭/৫/১৮ তারিখে মালয়েশিয়ার আলেকজান্দ্রিয়া আবেসিগাম নামের একজন মহিলা মানবাধিকার কর্মী নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রি মাহাতির মহম্মদকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের আবেদন করেছেন । আবেদনে নির্বাচনের পুর্বে মাহাতির মহম্মদ তার পুর্বের শাসনামলে (১৯৮১-২০০৩) গনতন্ত্রহীনতার চর্চ্চা এবং কিছু মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডের জন্য জনসমক্ষে দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন । সেই সংগে নির্বাচিত হলে মালয়েশিয়ায় গনতন্ত্র , সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পতিশ্রুতি দেন । আমার মনে হয়েছে উক্ত বক্তব্যের কারনেই মাহাতির মহম্মদ মহান । কারন রাজনীতিবিদ তো মানুষ এবং মানুষ তো ভুল করতেই পারেন । সে ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ এবং পরবর্তীতে সঠিক করনীয়টা করার অঙ্গিকার তার রাজননৈতিক সততা । এই সততার কারনেই শুধু মালয়েশিয়ার সাধারন মানুষ নয়, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা আনোয়ার ইব্রাহিমও মাহাতির মহম্মদের উপর দৃঢ় আস্থার ঘোষনা দিয়েছেন ।এটাই ছিল ৯২ বৎসর বয়স্ক একজন অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিকের ট্রাম্প কার্ড। তাই মালয়িদের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমি বলতে চাই ”মাহাতির মহম্মদ তোমাকে স্যালুট , তুমি দীঞর্ঘজীবি হও , তোমা থেকেই শিক্ষা নিক এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও জাতি গোষ্টির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ”। তবে এটাও ঠিক যে সেখানে অনÍত একটা গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের সুযোগ ছিল । বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ লড়াই করেছে সুশাসনের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য । সুশাসন ছাড়া যেমন কোন উন্নয়নই টেকশই হয় না তেমনি সুশাসন ছাড়া কথিত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জনগনের সম্যক কল্যানে আসে না । আবার পরিছন্ন গনতন্ত্রের অনুশীলন ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয় । রাষ্ট্রচিন্তকদের মতে , সঙ্ঘবদ্ধ ও সুশৃংখল জীবন , সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা সহ জনজীবনে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের দায়িত্ব , এ দায়িত্ব প্রতিপালিত হলেই কেবল সে রাষ্ট্রকে সফল রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। উপরোক্ত কথাগুলির মাধ্যমে যে পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যায় তাও গনতন্ত্র, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচারেই বার্তা । সুতরাং গণতন্ত্রকে সিমিত করা বা উপেক্ষা করা কোন ভাবেই যুক্তিসংগত নয় । বরং সুশাসনের প্রথম ও প্রধান শর্ত হল জনসাধারনের সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তার স্বার্থে পুর্ব নির্দ্দিষ্ট সময়ের ব্যাবধানে সুষ্ট , নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের ব্যাবস্থা করা । যদিও গনতন্ত্র জনসাধারনকে দায়িত্বশীল করতে পারে তার যেমন নিশ্চয়তা নাই তেমনি গনতন্ত্র সর্বোত্তম বা নিñিদ্র ভাবে নিরাপদ ব্যাবস্থা তাও বলা যায় না । তারপরেও গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার বিকল্প একমাত্র গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থাই । গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থার একটি বড় রক্ষাকবচ এই যে নির্বাচিত সরকার যদি পথ ও লক্ষভ্রষ্ট হয় তাহলে জনগন পরবর্তী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের কে বাদ দিয়ে নতুন সরকার প্রতিষ্টা করতে পারে । এতে করে পরিবর্তন হবে বিবর্তনমুলক , বৈপ্লবিক নয় । অর্থাৎ এর ব্যাত্যয় ঘটলে জনমনে অস্থিরতা বা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ধারনা শিকর গাড়তে পারে যা কোন ভাবেই কাম্য নয় । সুতরাং একটা দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধির ধারা অক্ষুন্ন রাখতে হলে অবাধ , নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের অর্থাৎ ”আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশী তাকে দিব” নীতিতে সম্পুর্ন গোপনীয়তায় নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে সে নিশ্চয়তা থাকতে হবে । সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে দক্ষ , সৎ , স্বচ্ছ ও জন কল্যানে নিবেদিত একটি প্রশাসন ব্যাবস্থা গড়ে তুলতে হবে । গনতন্ত্রকে শক্তিমান এবং চিরায়ত করার লক্ষে গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গসমুহকে অর্থ্যাৎ (ক) আইন প্রনয়নকারী জাতীয় সংসদ (খ) শাসন ব্যাবস্থা পরিচালনাকারী নির্ব্বাহী বিভাগ , (গ) আইনের শাসনের অতন্দ্র প্রহরী বিচার বিভাগকে দ্বিধা, শঙ্কা এবং ভয়হীনচিত্তে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে । (ঘ) একটি স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ , যা কিনা জাতির বিবেক হিসাবে কাজ করে , (ঙ) ক্রিয়াশীল ও দায়িত্বশীল একটি বিরোধীদল যা কিনা গনতান্ত্রিক , এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে । সরকারের দায়িত্ব উপরোক্ত প্রতিষ্ঠান সমুহের লালন এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া । বিরোধী দলের কাজই সরকারের গঠনমুলক সমালোচনা করা । সরকারকে সেই সমালোচনা গনতন্ত্রের মিত্রপক্ষের পরামর্শ হিসাবে গ্রহন করতে হবে । আবার বিরোধী দলকেও গঠনমুলক এবং বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্র তথা অর্থনেতিক সমৃদ্ধি তথা জনকল্যানের বিবেচনাকেই সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে । যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত একটা গ্রহনযোগ্য নির্বাচন নিয়ে শংকা কাজ করছে । এ দেশে কোন রাজনৈতিক দল বা দলের সরকার যদি এ দেশে গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থা এবং জনগনের কল্যানে সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ট্া করতে চায়, তাহলে অবশ্যই নির্বাচনি শংকাকে দুর করতে হবে । সকল মহলকেই মনে রাখতে হবে ”শুধু নির্বাচনই যেমন গনতন্ত্র নয় আবার নির্বাচন ব্যাতিরেকেও কিন্তু গনতন্ত্র নয় ”। এ দেশে গনতন্ত্র, সুশাসন, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার অর্থ্যাৎ মহান স্বাধীনতার চেতনার সফল বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনের এবং অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে ।
লেখক – রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট ।

LEAVE A REPLY