মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস এর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা ” মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা আমাদের অহংকার”

0
63

”মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা আমাদের অহংকার”

মোঃ সরোয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

 

আমরা বাঙালীরা কি বিস্মৃত জাতী। সব কিছুই কি খুব সহজে ভুলে যাই। জাতী হিসাবে আমাদের গর্বের, আমাদের মর্যাদার সময়, ক্ষনটুকু কি আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। মাত্র ৪৫/৪৬ বছর আগের কথা। যেদিন কি না বাংলা মায়ের সুর্য সন্তানরা, গর্বিত সন্তানরা নি:স্বার্থে জীবন বাজী রেখে সুন্দর গনতান্ত্রিক বংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছিল। তারা কি শুধুই জীবন বাজী রেখেছিল, না, স্বাধীনতার ঐ সুর্য টাকে ছিনিয়ে আনার জন্য অকাতরে জীবনও দিয়েছিল।

বাংলাদেশের খুব কম পরিবারই ছিল যারা কিনা পাকিস্থানী হায়েনাদের দ্বারা অত্যাচারিত বা কোন না কোন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নাই। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেবার জন্য, খাদ্য দেবার জন্য, তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য এদেশের দেশপ্রেমিক কত পরিবার লাঞ্চিত, অত্যাচারিত, নি:গৃহিত হয়েছে, কত পরিবারের বাড়ী ঘর জালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কত পরিবারের সন্তানদের তুলে নিয়ে যেয়ে অথবা স্বজনদের সামনেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, কত পরিবারের যুবতী মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে কি বিভৎস্য অত্যাচার করা হয়েছে তার পরিপুর্ন কোন পরিসংখ্যান কি আমাদের কাছে কিংবা রাষ্ট্রের আমলনামায় আছে। এই যে যুদ্ধ বিগ্রহ, ত্যাগ তিতিক্ষা, রক্ত প্রবাহ সবই কি শুধুমাত্র ঐ স্বাধীনতার জন্যই। আমার সংগে একমত হয়ে হয়ত অনেকেই বলবেন “না”।
কারন ঐ স্বাধীনতা শব্দটির সংগে আরও কিছু বিশেষন যুক্ত ছিল, তাহলে গনতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার। অর্থ্যাৎ গনতন্ত্র, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার সম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই ছিল মুল লক্ষ্য। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময়ে ঐ তিনটা বিষয় যেন পর্দার আড়ালে চলে গেছে। গনতন্ত্র শব্দটা মুখে মুখে থাকলেও তার যে কোন সংজ্ঞা আছে বলে মনে হয়না। আর দুটি বিষয় তা যেন অন্ধকারে আলো দিয়ে খুজে পাওয়ার ব্যাপার হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষক তার উৎপাদিত পন্যের নায্য মূল্য দাবী করছে, শ্রমিক ব্যস্ততার মজুরী বৃদ্ধির দাবী নিয়ে, ক্ষেত দিনমজুর বেঁচে থাকার তাগিদে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় মূল্যের দাম কম চায়, চাকুরীজিবীরা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বেতন বৃদ্ধি সম্বলিত জাতীয় পে-স্কেল, টাইমস্কেল, সিলেকসন গ্রেড প্রাপ্তি নিয়ে মৌন অথবা প্রকাশ্য আন্দোলনে ব্যস্ত।

এদেশের ছাত্র সমাজ কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে সকল ক্ষেত্রে অধিক সংখক মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদানের জন্য আন্দোলন করতে যেয়ে বিভিন্ন ভাবে অত্যাচারিত এবং নি:গৃহিত হচ্ছে। আবার মুক্তিযোদ্ধাগন তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, উত্তারাধিকারদের নিরাপত্তার সাংবিধানিক ব্যাবস্থা এবং কৌশলে কোটা সংরক্ষনের জন্য দাবী জানাচ্ছে। এভাবে সকল পেশার বা গোষ্টির মানুষ নিজ নিজ গোষ্টির স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। অবশ্য এর মধ্যে কিছু কিছু ব্যাক্তি, গোষ্টি বা রাজনৈতিক শক্তি এদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আর সমাজ তন্ত্রের স্লোগান নিয়ে ব্যাতি ব্যস্ত। কেউই জোর দিক হয়ে বলছেনা, দেশটি যে চেতনা, যে লক্ষ্য, যে আদর্শকে বুকে ধারন করে রক্ত স্নাত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, আমরা তার পরিপুর্ন বাস্তবায়ন চাই। অর্থ্যাৎ আমরা পরিপুর্ন গনতন্ত্র চাই, আমরা আইনের শাসন চাই, আমরা সামাজিক ন্যায় বিচার চাই। অথচ স্বাধীনতার পর থেকেই যদি এই চেতনাকে মূল লক্ষ্য হিসাবে ধরে নিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য দেশটি এগিয়ে যেত তাহলে আমার বিশ্বাস, এদেশে অনেক দু:খজনক ঘটনা ঘটার সুযোগ থাকতনা। মধ্যম আয়ের দেশের বা উন্নত দে্শের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য এত ঢোল সহরত বা প্রচার প্রপাকান্ডের প্রয়োজন ছিল না, ইতিপুর্বেই তা অর্জন সম্ভব ছিল।

স্বাধীনতার পর থেকে এপর্যন্ত প্রান্তিক পর্যায়ে অর্জন কিন্ত নেহায়েত কম নয়। শুধুমাত্র গনতন্ত, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের অভাবেই সে সব অর্জন দৃশ্যমান হবার পুর্বেই অর্থ্যাৎ জাতীয় উন্নয়নে সংযুক্ত না হয়ে উল্টো দিকে ধাবিত হয়েছে। আজকে মাদক নির্মুলের যে ব্যাবস্থা ব্যাবহার হচ্ছে তা কি কোন ভাবেই একাবিংশ শতাব্দির সভ্য সমাজে চিন্তা করা যায়। অন্য দিকে জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোন ভাষ্যই বলছে না যে এভাবে মাদকের বিস্তার নির্মুল করা সম্ভব বরং আশংকা হচ্ছে সমাজের আরও গভীরে প্রবেশ না করে। সন্ত্রাস, মাদক বা অন্যান্য সামাজিক অপরাধ যা সমাজকে আরও গভীর অবক্ষয় বা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তার উৎস স্থান নির্ধারন বা তার মুলোৎপাটনের প্রকৃত কোন কর্মসূচী দৃশ্যমান নয়। অনেকেই মনে করেন, এসব সামাজিক অপরাধের মূলে রয়েছে দূর্নীতি বাহ্যিক ঔষধ প্রয়োগ করে বা তথা কথিত যুদ্ধ পরিচালনা করে তা কি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

হাদিস শরীফে এসেছে, বদরের যুদ্ধের পরে আমাদের রাসুল (সা:) বলেছিলেন, ” আফজালুল জিহাদী, জিহাদীল নফসি “। আলেম ওলামাদের ভাষ্য মতে, এই কথার মাধ্যমে রাসুল সা: বোঝাতে চেয়েছেন, নফ্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের চেয়েও বড় যুদ্ধ। নফস মানুষের অন্তরে বসবাসরত একটি ক্রীয়াশীল শক্তি যা মানুষকে বাহ্যিক ভাবে খারাপ কাজ করার প্রচারনা দিয়ে থাকে। বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করে এই অপশক্তি কে দমন করা যাবেনা, এশক্তি দমন করতে প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শক্তির প্রয়োগ। ঠিক তেমনি সমাজের অস্থিমজ্জায় মিশ্রিত দুর্নীতি নামক ব্যাধিটির চিকিৎসা বাহ্যিক চিকিৎসা বা শক্তি প্রয়োগ করে সম্ভব নয়, প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শক্তির প্রয়োগ। সেই আধ্যাত্মিক শক্তি টা হচ্ছে, মৌলিক কিছু বিষয়ে জাতীয় ঐক্যমত্যের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। সামাজিক বা রাজনৈতিক কিছু বিষয়ের জাতীয় ঐক্যমত্যই পারে তৃনমূলে বিভাজিত জনগোষ্টি এবং শ্রেনী পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আর সমাজের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে ঘুষ, দুর্নীতি, মাদকের বিস্তারসহ সামাজিক অবক্ষয়ের ধারা গুলি প্রতিরোধ করে সামাজিক আন্দোলনের রুপ দিতে। কিন্তু এর জন্যেও প্রয়োজন সুস্থ গনতন্ত্রের চর্চা, সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসনের অনুশীলন। কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে এই মৌলিক বিষয়ে আন্দোলন সংগ্রামের কোন লক্ষন পরিলক্ষিত হয় না।

আমি মুক্তিযোদ্ধাগনের ৩জুলাই/১৮ এর কর্মসূচী বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি। যারা কি না পৃথিবীর সেরা দুর্ধর্ষ সেনা বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করে ছিল তাদের নামের পুর্বে ” বীর ” শব্দটি যেমন অহেতুক, ঠিক তেমনি কর্মকান্ড আর ত্যাগ তিতিক্ষার কার নেই ইতিহাস তার পাতায় যাদের অবস্থান ইতি মধ্যেই সুনির্দ্দিষ্ট করেছে তাদের নতুন করে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবীকে মন যেন বেমানান মনে হয়েছে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ৩ তারিখের স্মারক লিপিতে মুক্তিযোদ্ধারা যদি শুধু লিখতেন, ” মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে ছিলাম শুধুমাত্র লাল সবুজের পতাকা আর নির্দ্দিষ্ট সীমানার এই বাংলাদেশের জন্য নয়। আমাদের ছিল গনতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্টার দীপ্ত শপথ। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরেও সে সব কিছু অধরা থেকে যাওয়া আমাদের ব্যাথিত করছে।

দেশের চলমান গনতন্ত্রহীনতার সংস্কৃতি, বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড, ঘুষ দুর্নীতি, লুটপাট এবং অন্যান্য সামাজিক অনাচার আমাদের হ্নদয়ে রীতিমত রক্ত ক্ষরন শুরু করেছে। আপনি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসুরী, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী, আমরা আপনার নেতৃত্বে এসব অনাচারের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ করে, বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন, গনতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্টা করে সুখী, সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়তে চাই।” সত্যিই যদি এটাই স্মারকলিপির ভাষা হত, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস যে ভাবে সমৃদ্ধ হত তখন কি তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, উত্তরাধিকারদের নিরাপত্তার জন্য সাংবিধানিক ব্যবস্থা আর কোটা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন হত।


লেখক:- রাজনৈতিক বিশ্লষক ও কলামিষ্ট।

LEAVE A REPLY