লেখক ও কবি অর্ণব আশিক এর ভিন্ন মাত্রার জীবনধর্মীঅনুগল্প ‘’ দুইজোড়া পা“

0
33
লেখক ও কবি অর্ণব আশিক

দুইজোড়া পা

                       অর্ণব আশিক

গ্রামে এসেছি গতকাল। এখন ভোর। হাঁসে প্যাক প্যাক শব্দ আর কবুতরের বাকুম বাকুম শব্দ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি এখন জীবন বাগানের ফাঁকে ফাঁকে বেড়ে উঠা আগাছা-সংসারের রূপ দেখছি, এ সংসারে বাবার পরিচর্যা ছিল, মা এর আঁচলের স্নেহ ছিল। বাবা নেই তেইশ বছর, মা গত হয়েছেন পরের বছর, কি ভালোবাসা, একজনকে একা রেখে কত আর একাএকা থাকা, চলে গেলেন তিনিও। আজ ঘুম ভাঙতেই মনে পরলো মা ভোরে ঝাঁটা ধরতেন শুধু বাবার ঘরে। ঘুম চোখে আজ দেখি ধুলোর সঙ্গে মিশে থাকা শোকের বিন্দুগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে চৌকাঠ, আলগোছে থমকে আছে সুখের নিপাট শাড়ি আমার মায়ের।
মাএর ঝাঁটার শব্দ নেই, স্মৃতির জলজ গল্পগুলো ভেসে আসে জীবনের প্রবল ধারায়, বাবার দুচোখে ঘুম ছিলনা, আমার অসুখে, সারারাত ছটফট, সারা গ্রাম ঘুমে অচেতন, অসহায়তার সংজ্ঞা বাবা তখন।
মনে পড়ছে, আমি তখন ঢাবির তৃতীয় বর্ষে, বাড়িতে এসেছি, এমন প্রবল বর্ষা ছিল সেদিনও। আমাকে যেতে হবে সকালেই, রাতে দেখলাম বাবা-মা কারো মুখে কথা নেই, টেবিলে একরাশ খাওয়া, আমার প্রিয় খাওয়া, হ্যারিকেনের নৃত্যরত আলোতে চিককিক। রান্না ঘরে তখনো কোমরে হাত রেখে দাড়ানো মা, এখনো রান্না হচ্ছে পায়েস, ভোরের নাস্তার সাথে আমার খাবার। বাবা হাঁক পাড়ছেন, এসো খোকাকে খাবার দাও। বাবার চোখে শীতসকালের রোদ্দুরের মত ওম, রঙিন রেশমের মত হাসি, আমাকে নিয়ে ভাত খাবেন। এ যেন যিশুর লাষ্ট সাফার। টেবিলে সাজানো ভাতের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। আমি দেখি মাতৃত্বের সালতামামি, মা এখন কোথায়?
কথার পেছনে কথা চলে আসে, শব্দহীন কষ্ট ছুঁয়ে যায় হৃদয় গহীন। পুকুর পাড়ে দীর্ঘ তাল গাছ, ঘন তার ছায়া, দোলা দেয় দীঘীর জলের সোহাগ। উঠে আয় খোকা, জ্বর হবে, জলে ভেজা হাসের জীবন, তোর অভ্যাস নেই।
এখন সব চুপ। ভোরের মৌন ক্ষণ।
মায়ের পাকানো পায়েসটা নেই, দুঃখ শুধু কাঁপে চিনচিন, আমার দুচোখে নোনতা স্বাদ নেমে আসে, আমি দেখি দুই জোড়া পায়ের ছাপ-তাদের মহাপ্রস্থান।

LEAVE A REPLY