হাসান আহমেদ চিশতী —র, অনুপ্রেরণার চৌম্বুকত্ব এর অনন্য লেখা ‘’চিরবিপ্লবী কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল’’

0
452

চিরবিপ্লবী কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল

হাসান আহমেদ চিশতী

কালের গতিপথে যে মানুষটি অমিত সম্ভাবনার স্বপ্ন তৈরি করেছেন, তিনি আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় জসিম উদ্দিন মন্ডল। ঈশ্বরদী শহরের উপকন্ঠেই তাঁর দীর্ঘকালীন জীবনের বসবাস। উজ্জ্বীবনী শক্তিতে বলবান এবং উদ্যোমে মহৎ এই মানুষটি যেন সদা জাগ্রত বিবেক। মেহনতি মানুষের কল্যাণে চিরবিপ্লবী। যুগ ভাবনায় কালোত্তীর্ণ কবি-সাহিত্যিক যেমন থাকে, তেমন রাজনীতিবিদও রয়েছে। যেমনটা আমরা দেখেছি চিরবিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডলকে। যার বক্তব্য সাধারণ খেটে খাওয়া মুটে মজুরসহ গণমানুষের জীবনী শক্তিতে নির্যাস ভরে দিত। তাই তো কোথাও জনসভা হলে তাঁর উপস্থিতিতে গণমানুষের ঢল নামতো। মানুষ যেন তাঁর প্রতিটি কথায় গোগ্রাসে গলঃধকরণ করত। সেই কথাগুলিই মানুষের মুখে মুখে “ওরাল লিটারেচার”-এর মতো অর্থাৎ মৌখিক সাহিত্যের ধারায় থেকে যেত। যেমন- তিনি প্রায়ই বলতেন, “অংক কষিয়া রাজনীতি করিতে হইবে” এমনকি ধনীক শ্রেণিকে কটাক্ষ করে বলতেন, “তোর লাগে কত?” এমন বহু ধরনের আঞ্চলিক কথার চমক লাগানো সুন্দর উপলব্ধি থেকে তাঁর যুক্তিবুদ্ধির উপমা গ্রাম-বাংলার সকল চরাচরে মেহনতি মানুষের দূয়ারে দূয়ারে ঘুরে ফিরবে চিরকাল। জসিম উদ্দিন মন্ডলের প্রাত্যহিক জীবনের অনুশীলনে বোঝা যায় যে, তিনি একজন প্রকৃতি প্রেমিক মানুষও বটে, কারণ তাঁর ঘুমানো জায়গাতে জানালার পাশে নিম গাছের পাতাসহ ডাল ঝুলিয়ে রাখতেন এবং কাঠের চৌকিতে কাঁথা বিছিয়ে ঘুমাতেন। এছাড়াও নিমের দাঁতন (মেসওয়াক) ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন ফল-মূল ও ঔষধী গাছের বাগান চর্চা করতেন। বলতেন- বাংলার মাটি আর প্রকৃতিই আমাদের মঙ্গলময় জীবনের আসল নিয়ামক। আমার সাথে তাঁর সম্বন্ধ ছিল চাচা আর ভাতিজা, কিন্তু সখ্যতা ছিল বন্ধুর মতো। একই পথে আমাদের বসতবাড়ী। কোয়ার্টার মাইল দূরত্বের ব্যবধান মাত্র। তাই প্রায়ই খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে তাঁর সাথে নানা বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক একতা” ও ‘‘দৈনিক সংবাদ’’ পত্রিকা তিনি নিয়মিত পড়তেন এবং এ দুটি পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হতে দেখে তিনি যে কি পরিমাণ উল্লোসিত হতেন ভাবাই যায় না! ঘাড়ে হাত দিয়ে গর্বের সাথে বলতেন- তুই লেখা পাঠিয়ে আমার নাম বলবি, তোর কথা অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। সত্যিই আমার ভীষণ ভাল লাগতো এবং
অনুপ্রেরণার চৌম্বুকত্ব
বেড়েছে। আমি তাঁর বিপ্লবী জীবনের দূরন্ত কথাগুলি শুনতাম। কি-যে দারুণ সব আলোকিত অধ্যায়ের বর্ণাঢ্য জীবন তিনি বিপ্লবের পথে পথে পাড়ি জমিয়েছেন, সেই কথাগুলো কিছুতেই একবারে বলে শেষ করা যাবে না। তিনি একটি গল্প বলতেন- রাজকন্যা লাইলীর রাজপ্রাসাদের পাশে এক প্রতারক মজনু গোপনভাবে লাইলীকে বার্তা পাঠালো যে, সে তার প্রেমপাগল মজনু প্রাসাদের নিকটবর্তী জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে এবং অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এ কথা জানার পর লাইলী সরল বিশ্বাসে সেই মজনুকে খাদ্য-বস্ত্র পাঠানোর জন্য অতি সাবধানে একজন পরিচারিকাকে নির্দেশ প্রদান করে। এই ভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর সেই পরিচারিকার মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে পরিচারিকা রাজকন্যা লাইলীকে বলে যে, সত্যিই যদি সে আপনার মজনু হয় তবে আপনি তো সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। মনের অজান্তেই রাজকন্যা তার প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। তখন সে জিজ্ঞেস করে সেটা কিভাবে সম্ভব? পরিচারিকা তখন বলে- আজকে কোন খাবার না পাঠিয়ে আমি খালি থালা নিয়ে তার শরীরের এক টুকরা মাংস চাইবো আপনার জন্য। তাতে যদি সে সম্মত হয় তবেই প্রমাণ হবে সে আসল মজনু। রাজকন্যার অনুমতি নিয়ে পরিচারিকা যখন জঙ্গলে মজনুর কাছে গিয়ে খালি থালা দিয়ে বললো- রাজকন্যা আজকে কোন খাবার পাঠাননি, তিনি আপনার শরীরের এক টুকরো মাংস খেতে চেয়েছেন। এই কথা শোনার পর সেই মজনু সেখান থেকে দ্রুত পালায়ন করে, আর চিৎকার দিয়ে বলে আমি মাংস খাওয়া মজনু, মাংস দেয়া মজনু নই। আসলে এই গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি সামাজিক প্রেক্ষাপটের একটি বাস্তব দৃশ্যকে বোঝাতে চেয়েছেন। যার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই বহু জনসভায় বলেছেন যে, এদেশে মাংস খাওয়া মজনুর সংখ্যাই বেশী। এদের প্রকৃত দরদ পা-ফাটা, দাদ-আলা, খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি নিদারুণভাবেই কম। প্রচন্ড রকমের জনদরদী এই মানুষটি ভারত উপমহাদেশের ইনসাইক্লোপিডিয়ার মতো ইতিহাস বিপ্লবের জ্বলন্ত স্বাক্ষর। অথচ কি সাধারণ জীবন যাপন করে নজির স্থাপন করলেন মন, মনন ও মণিষায় যা আমাদের মনজগতের প্রতিটি স্তরেই স্বাধীকার ভাবনার ভীত নড়িয়ে দেয়। বয়স ও অভিজ্ঞতার গতিময় ধারায় তিনি ছিলেন সমুজ্জ্বল। আমাদের শহরের ঈশ্বরদী সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের তিনি আজীবন সদস্য। সময় পেলেই পরিষদের কার্যালয়ে এসে বসতেন। চা খেতে খেতে তাঁর স্মৃতিকথা আলোচনা করতেন। ত্রিশের দশকের ডাকসাইটে বহু কবি-সাহিত্যিকদের সাথে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে কলকাতায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সময়কালে। যেমন- বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, সত্যেন সেন সহ অনেকেই তাঁর কাছাকাছি আলোচনায় অংশ নিতেন। তিনি সাহিত্যিক ছিলেন না বটে, তবে সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতিতে তাঁর যে নিবিড় সখ্যতা ছিল তার মাত্রাও কম বর্ণাঢ্য নয়। ভারতের স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নিবেদিত সৈনিক কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল তাঁর জীবনের আকর গ্রন্থখানি রেখে গেলেন মেহেনতি বিপ্লবী মানুষের মন ও মণিষার মায়াকাননে।

লেখক পরিচিতি: হাসান আহমেদ চিশতী (প্রবন্ধকার ও উপন্যাসিক) তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা : ৬টি, জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লেখক হিসাবে পরিচিত ।

LEAVE A REPLY