হাসান আহমেদ চিশতী —র, বিশ্লেষণ ধর্মী নারী জাগরণে গ্রামীণ সমাজ পর্যালোচনা ॥ লোকজীবনে রাজনৈতিক চর্চা ও নারী জাগরণে লোকজ অনুষ্ঠানের কথকতা ॥

0
254
হাসান আহমেদ চিশতী (প্রবন্ধকার ও উপন্যাসিক)

॥ লোকজীবনে রাজনৈতিক চর্চা ও নারী জাগরণে লোকজ অনুষ্ঠানের কথকতা ॥

                                           ——হাসান আহমেদ চিশতী——

রেনইসেন্স বা সামাজিক বিপ্লবের প্রথম ধাপ শুরু হয় লোকজ অনুষ্ঠান এর মধ্য থেকে। আমরা ইতালির রেনইসান্স কিংবা ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব যে ভাবে জানি তার চেয়ে উনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবটা ছিল ভিন্ন রকমের। ফন্মার্টিন এর মত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতীতে নানা তথ্য সংগ্রহ করে যে বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হতে দেখা যায় তার ভিত্তিই নির্ণিত হয়েছে লোকজ ধারার অনুষ্ঠান কে কেন্দ্র করে।
অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন ঠিক ভাবে দানা বাঁধতে থাকে ১৮৮০ খৃষ্টাব্দের দিকে। তার আগে দেশ প্রীতিও স্বজাত্য বোধ জন্ম লাভ করতে থাকে নানা ধরণের লোকজ অনুষ্ঠানের ভেতর থেকে। রামমোহন রায়ের পর ধীর ধীরে যে বিপ্লব বা সংস্কৃতির নবজন্ম দেখা দেয় তা জাতীয়তাবোধে রেখাপাত করে যায় নতুন চেতনায় রাজনৈতিক সভা সমিতি শুরু হতো লোকজ অনুষ্ঠান দিয়ে। সেখানে জারি, সারি, ঝুমুর, গম্ভীরা, পাঁচালি প্রভৃতি লোকগীতি বা লোকসংগীত দিয়ে জাগরনের বানী বন্দনা করা হত। তাই ধর্ম-বর্ণ ভেদে মুক্তি সংগ্রামে লোকজ সংস্কৃতির অনুষ্ঠান যেন হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারন করে আছে। কারণ এই লোকজ ধারার সাথেই জড়িয়ে আছে আমাদের মূল শেকড়ের পরিচয়। আমাদের জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কৃষ্টি, কালচার ও দর্শন লোকজ সংস্কৃতিতে আবহমান কাল থেকে প্রবাহিত হয়ে আছে তাকে প্রকৃতভাবে লালন পালন করার মধ্যেই নিজস্ব সত্ত্বার প্রকাশ ঘটে এবং লোক জীবনের আন্তরীক সম্বন্বয় সাধনেও তার ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
পৃথিবীর সকল সভ্য জাতিই তাদের লোকজ সাংস্কৃতিক ধারাকে শ্রদ্ধার সাথে লালন করে নিজেদের কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই দর্শনিক হান্ডু বলেছেন- ‘‘ ফোকলর ডাজ নট ডাই’’ এই কথার পাশাপাশি সমাজ বিজ্ঞানেও বলা হচ্ছে, যে জাতির সংস্কৃতি যত উন্নত এবং আপন কৃষ্টি কলায় শ্রদ্ধাশীল, সে জাতি তত উন্নত।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের লোকজ অনুষ্ঠানের ভেতরদিয়ে যে রাজনৈতিক চর্চার প্রকাশ ঘটেছে তারও নানাবিধ বিকাশের বা জাগরনের বিচিত্র ঐতিহ্য রয়েছে। ঊনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে নারী উন্মেষের যে অধ্যায় রচিত হয়েছিল, সেখানে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ীর অবদান বিষ্ময়কর। কেননা রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঠাকুরবাড়ীর মহিলারা জীবনচর্যার শিক্ষা সমৃদ্ধির সকল ধারায় যেভাবে নিজেদের পরিধির অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রেখেছেন সেও একাগ্র নারীমুক্তির স্বর্ণ সময় ছিল। ঠাকুর বাড়ীতে প্রত্যেক বিয়েতে একটা করে থিয়েটার হতো। ছেলেরা ও মেয়েরা একটা করে নাটক অভিনয় করতেন। প্রায় এক যুগ ধরে (১৮৮১-১৮৯২) বাল্মীকি প্রতিভার বহু মঞ্চাভিনয় হয়েছে। প্রতিবারই শ্রীযুক্ত বাবু হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা প্রতিভা সরস্বতী সেজেছেন এবং বাল্মীকি হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অপরাপর সরোজা সুন্দরী এবং ঊষাবতী দ্বিজেন্দ্রনাথের দুই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের পুত্রের দৌহিত্র বংশে- মোহিনী মোহন চট্টোপাধ্যায় এবং রমনীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মোহিনী মোহন ভারতীয় থিয়সফিষ্ট আন্দোলনের উদ্যোক্তা; পরে তিনি দীর্ঘ্য সাত বছর আমেরিকায় বাস করেন। বহু গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। প্রসঙ্গক্রমে ধারা বর্ণনায় কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও লোক জীবনের প্রকৃত নির্যাস যারা ধারণ করেছে তাদের কথাই সর্বশ্রদ্ধা বহন করে চলেছে। যেমন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা প্রজ্ঞার বিয়ে হয়েছিল অসমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজারুয়ার সাথে। তখন অন্ত:পুরওবাসিনি প্রজ্ঞা রান্না বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন এবং স্বামীর উৎসাহও পেলেন। এমনকি বাংলার রন্ধন শিল্পকে যদি লোক শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে প্রজ্ঞার নাম সবার আগে উচ্চারিত হবে। কারণ রান্নাগুলির অধিকাংশই গ্রামবাংলার লোকজীবন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া। যা নাকি বঙ্গ নারীর নিজস্ব ভাষা। যেমন- বাখরা=পাপড়ি, চুটপুট=ফোড়ন ফাটার শব্দ, হালসে=কাঁচাটে বিস্বাদ গন্ধ। রুটিতোষ=সেকাঁ পাউরুটি, পিট্না=যাহার দ্বারা মাংস পেটানো হয়। কালিখোলা=কাট খোলায় বালি দিয়ে জিনিস ভাজা, সিনা=বুক, চমকান=শুকনা খোলায় অল্প ভাজা। তৈ=মালপোয়া ভাজিবার মাটির পাত্র। তিজেল হাঁড়ি=ডাল রাঁধিবার চওড়া মুখ হাঁড়ি। তোসো হাঁড়ি=ভাত রাধিবার বড় হাঁড়ি। খন্ডকাটা=ডুমা ডুমা টুকরো কাটা। চিরকাটা=লম্বাভাবে ঠিক অর্ধেক করিয়া কাটা। ছুঁকা=ফোড়ন দেওয়া।
এছাড়াও আছে গৃহিনীদের নানা বৈচিত্রময় তথ্য। একবার সবাইকে তাক লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চাশতম জন্মদিনে ফুলকপি, খোয় ক্ষীর, বাদাম, কিশমিশ, জাফরান পাতা, সোনা রুপোয় তবক দিয়ে বরফি তৈরী করে প্রজ্ঞা দেবী তার নাম দিয়েছিলেন ‘‘কবি সম্বর্ধনা’’ বরফি। খেয়ে কেউ বুঝতেই পারেনি সেটি ফুলকপি দিয়ে তৈরী। হেমেন্দ্রনাথের পঞ্চম কন্যা শোভনা সুন্দরী জয়পুরী উপকথা সংগ্রহ করেছিলেন কাহাবৎ বা জয়পুরি প্রবাদ। ১৯০০-১৯০১ সালে প্রবাদ সংগ্রহ দিয়েই বিভিন্ন প্রদেশের লোকজকথার অর্থ উদ্ধার, অনুবাদ এবং বাংলায় সমার্থক শব্দ প্রবাদ অনুসন্ধান করে লোকগাঁথার গ্রন্থ রচনা করেন। তারও আগে অবশ্য লালবিহারী দে লিখেছেন, ‘‘ফোক টেলস্ অব বেঙ্গল (১৮৮৩)’’। সুতরাং ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা দেখিয়েছেন, প্রগতির সঙ্গে শাশ্বতকে বেঁধে রেখে কী করে সমাজকে গড়ে তোলা যায়। শুধু এই কারণেই বাঙালি মেয়েদের ওপর তাঁরা স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। লিলিয়ান পালিত, রমলা সিংহ, রানি নিরুপমা, সুনীতি দেবী, সুচারু দেবী, মৃণালিনী সেন ও আরও অনেকেই সেদিনকার ধনী সমাজে আলোড়ন জাগিয়ে নতুন উদ্দীপনায় সমাজ সংস্কারের জোয়ার বিনির্মাণ করেছেন। তাদের পাশে আরো প্রভাব ফেলেছেন- সরলা রায়, অবলাবসু, কুমুদিনী খাস্তগীর, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, চন্দ্রমুখী বসু- দলে দলে মেয়েরা লেখাপড়াসহ লোকজ ধরার মিলন মেলায় একাত্ম হয়েছে এবং তাদের ঐশ্বর্যমন্ডিত কর্মধারা ক্রমবর্ধমান মহাকালের অগ্রণী ভূমিকায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের নক্ষত্র সমুজ্জ্বল হয়ে আছে আমাদের অবিভক্ত বাংলায়।

দশক বিভাজনে লোকজ অনুষ্ঠানের সাথে সাথে আমাদের রাজনীতির ধারা পরিবর্তন শুরু হতে থাকে। এটা ছিল মূলতঃ সমাজ বিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত কিন্তু লোকজ অনুষ্ঠান পরিবার প্রথা থেকে সামাজিক প্রথায় সকল সহ অবস্থানে অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করতো। ফলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লোকজ অনুষ্ঠান হয়ে পড়তো প্রাণের মিলন কেন্দ্র। যার ধারাবাহিকতা আজও আমাদের গ্রাম-বাংলা তথা লোকজীবনের অঞ্চল ভেদে বহুবিধ মেলার আয়োজন নিয়ে সামাজিক উৎসবের প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
অপর দিকে ইংরেজ শাসন আমলের দুইশত বছর পার হলেও আমারা কিন্তু ইংরেজ হয়ে যাইনি। বরং আমাদের লোক সংস্কৃতি, দর্শণ এবং কৃষ্টি কালচার ততোধিক প্রসারিত হয়ে জীবন বোধের বিকাশ ত্বরান্বিত করেছে। সর্বময় সামাজিক দুরাচারকে শিক্ষা দিতে, বিপ্লব, সংগ্রামের জাগরনে লোকজ অনুষ্ঠানই প্রধান বিষয় হয়ে উঠতো।
কেননা মানুষ তাদের মনের আসল কথাটাই এই লোকজ সংস্কৃতির ধারায় প্রকাশ ঘটাতো। ফলে লোকজ শিল্পের বিস্তৃতি এতোটাই প্রভাব সৃষ্টি করেছে যেখানে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে জীবন জীবিকায় আশ্রিত বহু দল বা গোষ্ঠির ভিন্ন ভিন্ন ঘারানার অবস্থান সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। কারণ পারিবারিক জীবনে বিয়ে পার্বনে লোকজ অনুষ্ঠান ছিল অত্যাবশ্যক। এমন কি সেখানে যে সকল লোকজ দর্শণ প্রতিফলিত হতো সেটা যেন ‘কনে আর বরের’ জন্য সারাজীবনের পাথেয় হয়ে সুখের সংসার সুন্দর ভাবে টিকে থাকে এবং সব ধরণের অপশক্তির হাত থেকে তাদের রক্ষা করে তারই প্রতিকারের নিয়ামক প্রতিরূপ হিসাবেই লোকজ অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত।
এছাড়া গ্রাম-বাংলার কৃষিক্ষেত্রে লোকজ দর্শণ ছিল অতুলনীয়। বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদ কিংবা উপনিষদ এর বিশেষত্ব লক্ষ্যনীয়। সেই কালীদাস পন্ডিতের কথা, ভারতচন্দ্রের কথা, খনার বচনের কথা এখনো গ্রাম-বাংলার মানুষের মুখে মুখে রয়েগেছে। এরই সাথে বহু ধরনের বাউল তাত্ত্বিকদের রচনা এবং পুথি রচয়িতা রয়েছে লোকজ গাঁথা নিয়ে যার অজানা তথ্য এখনো মানুষের মুখে মুখেই গ্রন্থিত হয়ে ফিরছে।
একই ভাষাভাষির ‘‘কৃষ্টি’’ শব্দটি নিয়ে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে জাতি কিংবা সমাজের মূল্যবোধ, সাহিত্য, আচার-আচরণ, রাজনীতি উৎসব পার্বনসহ জীবনবোধের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই লোকজ ধারার মাত্রাগত প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। তাই আজও অবিভক্ত বাংলার লোকজ দর্শণে কোন বৈপরীত্য পাওয়া যাবে না। নীহারঞ্জন রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংস্কৃতি বিষয়ক সংজ্ঞার সম্পৃক্ততাও মূলত: লোকজ ধারাকে কেন্দ্র করেই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রতি স্থাপিত হয়েছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ বলছেন, ‘‘আত্মসংস্কৃতি র্বাব শিল্পানি’’- অর্থাৎ এখানে বলতে হয়, আত্মার যে সংস্কৃতি-শিল্প সেটাতো লোকজ ধারার অনুষ্ঠানেরই অংশ। পবিত্র সরকার তার লেখায় বলছেন- ‘‘মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিল, আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়ালো- এই দুই এর তফাতই হলো সংস্কৃতির তফাৎ। পৃথিবীর জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্টি যা কিছু সেসবই সংস্কৃতি, বাকিটা প্রকৃতি’’। লোক ভাষা (লোক সংস্কৃতি, কলিকাতা-১৯৯১)। অতএব হাজার বছরের বাঙ্গালীর প্রথাগত ভাবেও লোকজ ধারা অবদমিত সৃষ্টিশীল চেতনায় জাগ্রত। নান্টু রায় সম্পাদিত ‘‘ভারত বিচিত্রা’’ এই উপমহাদেশের লোকজ ধারা নিয়ে বহু ধরণের প্রবন্ধ-নিবন্ধ বরাবরই প্রকাশ করে থাকেন। প্রসঙ্গত ২০০৯ এর সংখ্যা-০৭ এ প্রকাশিত উৎসব পৃষ্ঠায় ‘‘ভারতীয় শিল্পকলায় উৎসব’’ শিরোনামে উৎপল কুমার ব্যানার্জির লেখাটিতে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যসহ লোক জীবনের অনবদ্য বর্ণাঢ্য শিল্পকলার যে প্রতিফলন স্বল্প পরিসরে জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা দেখতে পাই সেটা অন্তর্জগতগত ও বহির্জগতের সঙ্গে, প্রকৃতি মাতার সঙ্গে, পরমপুরুষের সঙ্গে এবং আনন্দ ও বিষ্ময়বিমুগ্ধতায় অন্তরের অন্ত:স্থলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একান্ত প্রয়াস।
অপরাপর এই উপমহাদেশের বিস্তৃর্ণ গ্রামীণ জীবন কৃষিকে কেন্দ্র করেই গৃহদেবতার আরাধনায় আপন সমৃদ্ধির আয়োজনে লোকজ অনুষ্ঠানের বহুমাত্রিকতায় অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। কৃষক মাঠে ধান বুনার আগে লোকজ অনুষ্ঠান করেছে এবং ধান ঘরে তোলায় ও নবান্নের লোকজ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে থাকে। তাই এদেশের সমৃদ্ধ লোকজ অনুষ্ঠানের বিচিত্রতা এতো ব্যাপক যে এর বর্ণনা স্বল্প পরিসরে করে ওঠা কঠিন। বিশেষ করে এই সমস্ত অনুষ্ঠানের অতিথি অ্যাপ্যায়নের ও একটা বড় অংশ রয়েছে লোকজ ধারায়, যার ঐতিহ্য ধারন করে গ্রাম-বাংলায় নানা ধরণের পিঠা-পুলি, ফিন্নি-পায়েস এবং সেই সংগে মাছে ভাতে বাঙ্গালির ইলিশ যেন আভিজাত্যের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। আজও এই ধারা তেমনি আছে। বোশেখ এলেই ইলিশের বাজার দর কেমন জানি বেড়ে যায়। এবার আমরা লোকজ অনুষ্ঠানের পালা পার্বন আর গীতি বাদ্যের কথায় যদি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখা যাবে আমাদের মত এতো সমৃদ্ধ কৃষ্টি-কালচার আর পৃথিবীতে কারো নেই। কারণ এতো বেশী পালা এবং গীতের সমারোহ আছে তা শিশুর জন্মাবস্থা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লোকজ অনুষ্ঠানের অংশিদারিত্বে অবস্থান করছে। সেই সাথে লোক বাদ্য যন্ত্রের বিপুল ঐশ্বয্য আছে আমাদের যেমন ঃ- (১) একতারা (২) দোতারা (৩) সারিন্দা (৪) আনন্দ লহরী (৫) লাউ (৬) থুনথুনে (৭) বাঁশি (৮) করতাল (৯) ঝাঁঝর (১০) মন্দিরা (১১) কাঁসি (১২) ধামসা (১৩) মৃদঙ্গঁ (১৪) ঘুঙুর (১৫) মাদল (১৬) শিঙ্গাঁ (১৭) ঢোল (১৮) খঞ্জনী (১৯) প্রেমজুরী (২০) কলিজা খেউড়ি (২১) টিকারা (২২) ব্যানা।
এই বাদ্য যন্ত্র গুলোর অধিকাংশই গ্রামীন উপকরণ দিয়ে লোকজ ধারায় নির্মিত হয়ে থাকে। খমক, গুবগুবি, গোপাযন্ত্র এর ব্যাবহার দেখে খুবই সহজ মনে হয় কিন্তু এর সুরতাল বড়ই মধুর ধ্বনি সৃষ্টি করে। আসলে লোকজ অনুষ্ঠান একেবারেই মাটি ও মানুষের গভীর থেকে উঠে এসেছে। তাই এটাকে প্রত্যেকটি অঞ্চল ভেদে মানুষ তার বুকের ভেতর লালন করে।
এমন কি আমাদের এই উপমহাদেশের প্রত্যেকটি আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিপ্লবের গোড়া পত্তন বা ভীত রচনা হয়েছে এই লোকজ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সুতরাং এর যে এক সর্বাত্মক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে তা সহজেই অনুমান করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
আজ এই বিশ্বায়নের যুগে ডিস এন্টেনা, ইন্টারনেটের কৃপায় বিস্তৃত আকাশ সংস্কৃতি যদিও আগ্রাসী কায়দায় বাধাগ্রস্থ করছে প্রত্যেকটি স্বকীয় ধারাকে এবং নিজস্ব লোকজ অনুষ্ঠানকে। তারপরও কিন্তু থেমে নেই আমাদের লোকজ অনুষ্ঠান তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই প্রতি বছরই এপার বাংলা ওপার বাংলায় বৈশাখী মেলাসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে জমে ওঠে মেলার নানামুখি স্বাড়ম্বর অনুষ্ঠান। যদিও কিছু অপশক্তি আমাদের দেশে এই লোকজ সংস্কৃতিকে ধর্মের অজুহাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চায় এবং সুযোগ বুঝে নানা হত্যাকান্ডসহ বোমা হামলা চালায় তার উদাহরণ আমাদের দেশে রয়েছে। তবে সব চেতনা সম্পন্ন মানুষ সব সময়ের জন্যই এই বিষয়ের প্রতি তার প্রশাসনিক সজাগ দৃষ্টি দিয়ে নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট থাকেন বিধায় অপশক্তির ছায়া না লাগলেও যে আশেপাশেই থাকে সেটাও আমাদের বোধের ভিতরে কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায় যে, এই লোকজ অনুষ্ঠান আমাদের মূল শেকড়ের সন্ধান দিয়ে যায়, সেখানে রয়েছে আমাদের আসল পরিচয়। দেশ ও জাতি গড়তে এই পরিচয়ই নবজাগরনে উদ্বুদ্ধ করে সমৃদ্ধির বাতাবরণ তৈরী করতে পারবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। সুতরাং লোকজ অনুষ্ঠানকে লালন-পালন করতে হবে প্রাণের ছোঁয়ায় এবং মিলন মেলার আপন সুরে গেঁথে দিতে হবে হৃদয়ের একান্ত স্পন্দনে। এই প্রত্যাশা সকলের জন্যই শুভ দিনের সূচনা করবে আর সরিয়ে দেবে সকল গ্লাণী, ব্যর্থতা, শুরু হবে দিন বদলের পালা—-॥

লেখক পরিচিতি: হাসান আহমেদ চিশতী (প্রবন্ধকার ও উপন্যাসিক), জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লেখক হিসাবে পরিচিত ।

LEAVE A REPLY