হাসান আহমেদ চিশতী —র, বিশ্লেষণ ধর্মী সমাজ পর্যালোচনা ‘’অর্থনৈতিক সমাজ কাঠামোতে অপরিকল্পিত পরিবার-পরিকল্পনার বিরূপ প্রভাব’’

0
159
হাসান আহমেদ চিশতী প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

অর্থনৈতিক সমাজ কাঠামোতে অপরিকল্পিত
পরিবার-পরিকল্পনার বিরূপ প্রভাব

 

— হাসান আহমেদ চিশতী—

সম্প্রতি উন্নয়ন অবকাঠামোর গাণিতিক প্রবাহ যে মাত্রায় ধরা হয় সেখানে শিক্ষার হার ৫৬% শতাংশ থেকে যে কার্যকরণে এগিয়েছে তাতে বুদ্ধি বিকাশ সম্পন্ন প্রকৃত বিদ্বানের সংখ্যা আণুপাতিক বিবেচনায় শংকা সৃষ্টিই করে। অথচ সরকারী, বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার, কৃষি কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, সরকারী-বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ, সরকারী পলিটেকনিক কলেজ, মেরিন একাডেমিসহ বহু কারিগরী প্রতিষ্ঠান ও কম্পিউটার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে। ১৯৯২ সালে সারাদেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়। শিক্ষা ও কর্মে সবার অধিকারই দেশকে প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ত্বরান্বিত করতে পারে। অথচ আমরা যে সকল তথ্যচিত্র অনুধাবন করে চেতনার সংঘাতে পর্যুদুস্থ তা হলো ঘুষ-দূর্নীতিসহ অবক্ষয়ের মাত্রাই শুধু অতিক্রম হয়ে চলেছে। যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাচক্রে ডনেশন, স্বজনপ্রীতি, রাজনীতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত সত্যে রূপ লাভ করে সেখানে মেধার প্রতিযোগিতা প্রতারণা মাত্র এবং দরীদ্র শ্রেণীর ভাগ্য বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। এখন ধীরে ধীরে অফিসারেরা ছাড়ছেন টাই, কেরানিরা ধরেছেন প্যান্ট। এই নিচের মহলে যোগ ও উপরের মহলে বিয়োগ এর ফলে পোশাকের একতলা ও দোতলার দূরত্ব কমে গিয়ে মাঝখানে একটা নতুন তলার উদ্ভব হয়েছে, স্থপতিদের ভাষায় যাকে বলে মেজেনাইন ফ্লোর। সেখানে শ্রী ছন্দহীন একটা আঙ্গার বলের সর্বব্যাপী বিস্তার। তার নাম বুশশার্ট। প্রাচীন ফতুয়ার আধুনিক শোভন সংস্করণ ইংরেজিতে যাকে বলে ডিলাক্স এডিসন। ভারতবর্ষে কালোবাজার ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বিগত মহাযুদ্ধের এটি তৃতীয় অবদান- যাযাবর। অপরদিকে আমাদের দেশে পরিবার পরিকল্পনার বিরূপ প্রভাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠি সংখ্যা লঘু হয়ে পড়েছে। বিষয়টি শুনতে যেমনই মনে হোক এর যথার্থতা কিন্তু স্বীকার না করে উপায় নাই এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মর্মান্তিক পরিপ্রেক্ষিতও রয়েছে। যার বিস্তৃত বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায় বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষই দু’একটি সন্তানের জনক-জননী। অপরদিকে কম শিক্ষিত কিংবা নিম্নশ্রেণীর পেশায় সম্পৃক্তদের সন্তান-সন্ততির বাহারি সমাহার প্রতি বছর ১টা করে লেগেই আছে। রঙ রসে অনেকেই বলে থাকে যে এখানেও ইরির আবাদ যেমন ১টা পাশে, ১টা কোলে আর ১টা ঝোলে। বড়ই দুঃখজনক যে, এখনও এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এখানে চেতনার বিকাশ আর বিস্তৃতিতে চলেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। বস্তিপাড়ায়, জেলে পাড়ায়, কুমার পাড়ায় আর কুলিপাড়ায় গেলেই চোখে পড়ে এ ধরনের দৃশ্য। যাদের অস্তিত্ব টিকে থাকে শুধুই শোষকের উপাত্ত হয়ে। প্রতিটি মলিন চেহারায় আঁকা আছে দাসত্বের আঁচড়। দাসক্ষত দিয়ে তারা তাদের প্রতিনিধিদের প্রার্থনায় নত শির। শিক্ষিত সাধারণ মানুষ সংখ্যালঘু হয়ে গেছে তাদের কাছে। একজন শিক্ষিত মানুষ তার দু’একটি সন্তানকে সুশিক্ষিত করার জন্য ভাল কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বিদেশে পাঠিয়ে দেয় আর আশায় আশায় শেষ জীবনে কখনো অনুসঙ্গ অথবা নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। অর্থ বিত্তের পরিত্যক্ত স্থান দখল করে নেয় পাহারাদারী শর্তের আওতায় ঐ সকল পরিচিত সংখ্যাগুরুদের কেউ একজন। এমনি একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায় যে, জনৈক একজন সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা স্ত্রী তাদের দুই সন্তানকে বিদেশে লেখাপড়া করার জন্য পাঠালে তারা লেখাপড়ায় সুনাম অর্জন করে বিদেশেই থেকে যায়। অপর দিকে শেষ বয়সে সেই শিক্ষিত দম্পতি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে তাদের সন্তানরা আর ফেরৎ আসেনি। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের অনেক মেধাও পাচার হয়ে গেছে বিদেশে। অপর দিকে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো আয়েশ করে আধপেটা খেয়ে এক গাদা সন্তান সন্ততি আর নাতিপুতি নিয়ে সোর-সোল্লাসে জনবল প্রদর্শন করে প্রার্থিত প্রতিনিধির প্রতাপ বাড়িয়ে তুলছে। এদের ভেতরে মাতা ঝি এর কাজ করলে পিতা প্যাডেলার অর্থাৎ রিক্সাচালক এবং সন্তানেরা মুটেগিরি কিংবা হকারিতে, প্রত্যেকেই কর্মজীবী এবং নির্ভিক চিত্তের দাসত্ব প্রধান গোষ্ঠি বা সম্প্রদায় এর অন্তর্গত। এদের নিজেদের ভেতরে বিবাদ-বিষ্মবাদ যাই থাকুক না কেনও শুধু মালিক পক্ষ বাদে যে কারো বিপক্ষে জোট বদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ প্রতিহত করতে এদের জুড়ি মেলা ভার। এই বিষয়গুলি নিয়ে বেশ কিছু সমাজ উন্নয়ন কর্মকান্ডে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনার এক পর্যায়ে জানা যায় যে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর শিশু শ্রম যেমন আছে আবার সেই সাথে বিশেষ কিছু অবৈধ চক্র এদের দিয়ে মাদক পাচারসহ বহুবিধ অপকর্ম সংগঠিত করে থাকে। ফলে এই শ্রেণীর শিশুরাও মাদকাসক্ত হচ্ছে। প্রসঙ্গত:ই বহুবিবাহ ও যৌতুক প্রথা শ্রেণী চরিত্রের কিছু অংশে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এদেশের সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনার মধ্যে ধর্ম বিশেষভাবে আবর্তিত। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতেও মডারেট কোন প্রক্রিয়ার এমন কোন উন্নয়ন না হওয়ায় পশ্চাদপদতা চরমভাবেই রয়ে গেছে এবং দরীদ্র জনগোষ্ঠির এক বিপুল অংশের সম্পৃক্ততা রয়েছে এই সকল ক্ষেত্রে। দুঃখজনক যে, নিবন্ধিত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা দিয়ে বেশ কয়েক হাজার জন উত্তীর্ণ হলেও বিদ্যালয়গুলি জাতীয়করণ এর পর তাদের আর চাকুরী হয়নি। প্রসঙ্গের গভীরে নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা প্রভাবশালী মহল দ্বারা নিয়ন্ত্রণ হয়ে দরীদ্র শিক্ষক প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের পিটুনিতে হাসপাতালে যায় তখন মনে হয় কোন শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড ? এর থেকে পরিত্রাণ খুঁজে ফিরছে মানুষ। যদিও কর্মমুখি তারুণ্য সৃষ্টি, বেকারত্ব নিরসন এবং স্বাস্থ্যসম্মত পারিবারিক জীবন নিশ্চিতসহ সুস্থধারায় অর্থনৈতিক সমাজ গঠনে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে বহু ধরনের উন্নয়ন কর্মীরা কাজ করছে, তবু রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেন অপ্রতুল হিসাবেই গণ্য হচ্ছে। কারণ এদেশের বিপুল পরিমান দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে আত্মসচেতন করে তুলতে একমাত্র এনজিওদের যে ভূমিকা রয়েছে সেটা অনস্বীকার্য্য। এরপরও সরকারীভাবে বেশ কিছু মনিটরিং এর অভাবে কিংবা দীর্ঘ সূত্রিতার প্রশাসনিক অব্যবস্থায় মূলত পরিবার পরিকল্পনার প্রকৃত কিছু অঞ্চল ব্যর্থ হয়ে গেছে। তা না হলে আজকের এই বৈসাদৃশ্য হয়তো লক্ষ্যনীয় পর্যায়ে আসতো না। পাশাপাশি মানুষের মননশীলতা সৃষ্টি এবং সুচিন্তার বিকাশে শিক্ষার কোন বিকল্প নাই এই বিষয়টি ও সামনে রেখে এনজিও তৎপরতার প্রসার কিন্তু হয়েই চলেছে। অপরদিকে ৩০ হাজার আইটি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারী ব্যবস্থাপনার কথা জানা যায়। সেইসাথে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশী ঋণ সহায়তা বৈদেশিকভাবে বেড়েই চলেছে। ২০০৬ সালে সবার জন্য শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং তার ধারাবাহিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবু প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হওয়া সত্বেও মাতা পিতার অজ্ঞতা ও দারিদ্রতার কারণে প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে না। বিগত দিনের একটি পরিসংখ্যান থেকে যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৯৫,৮৮৬ এবং বাৎসরিক শিক্ষার্থীর হার ছিল ১৬.৭০ মিলিয়ন। এছাড়াও ১১,৪৮৮টি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪.৫ মিলিয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার। এরপরও সরকার বাজেটে শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নির্ধারণ থাকলেও। একটি কথা এখানে পরিষ্কার যে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সাথে শিক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপক অসামঞ্জস্যতাই প্রমান করে সরকারী বিধি ব্যবস্থাকে শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত করছে এক শ্রেণীর অনৈতিক বন্দোবস্তোকারী কিংবা কর্মকর্তা। এই অবস্থার নিরসনে সরকার অব্যাহত গতিতে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানের রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মননধারায় যে আঘাত তৈরি হয় তা থেকে বলতেই হয়– নাই ভগবান নাই-কো ধর্ম যাদের শিক্ষামূলে/ছিন্নমন্তা শিক্ষা সে শুধু শয়তানী ইস্কুলে- যতীন্দ্রমোহন বাগচী/চাষার ঘরে। ভাষার দিক থেকে বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্য তো অনন্য ধারায় বহমান। মৈথিল কবি বিদ্যাপতি ও বাংলাদেশের কবি চন্ডীদাস এর ভাব বর্ণনায় নতুন প্রাণ সঞ্চার ঘটেছিল জগৎ ও জীবন জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে। বর্বরতায় নৈতিক অবক্ষয় এর একটা দুঃসময় চলছিল। এ অঞ্চলে ধনবান, বিদ্যান, আচার্যপন্ডিত সবই ছিল কিন্তু অবস্থাটা তলানীতে ঠেকেছিল; সেই ছবিই বিদ্যাপতির কয়েকটি পংক্তি- কত বিদগ্ধ জন, রস অনুমানই/অনুভব কাহুক না পেঁখ/বিদ্যাপতি কহে, প্রাণ জুড়াইতে/লাখে না মিলয় এক।
সুতরাং সরাসরি আইন করে হলেও ক্ষেত্র বিশেষে পরিবার পরিকল্পনার আওতায় সন্তান-সন্তুতির হার নির্ধারন করার জন্য আয়ের উৎস বা খাতওয়ারী পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে চরম ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ বলে মনে করা হয়। কারণ নিম্নশ্রমের বা স্বল্প আয়ের মানুষ যদি এই বিধির আওতায় সঠিকভাবে থাকে তবে পরিবেশসহ নানাবিধও কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা ফিরে আসার সহায়ক হবে এবং রাজনৈতিক পেশী শক্তির দ্বারা যে দূর্বৃত্তায়ন হয় সেটাও নির্মূল হওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে। কারন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানা অভাব অভিযোগের ভিত্তিতে এই সমস্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠির থেকে অর্থের লোভে সন্ত্রাসী ও অবৈধ কর্মকান্ডের বিস্তার চরমভাবে হয়ে থাকে। পরিবার পরিকল্পনার প্রকৃত ব্যবস্থা ঠিকমত চালু থাকলে ঐ সমস্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠির ভেতরে মানউন্নয়নসহ অনৈতিক জনবল কম হয়ে যাবে। তাই উল্লেখিত বিষয়গুলি সার্বিক পর্যালোচনা করে সরকারের উচিৎ বিশেষ মনিটরিং বিধি ব্যবস্থায় জরুরী পদক্ষেপই এই ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই দিতে পারবে।

লেখক পরিচিতি: হাসান আহমেদ চিশতী (প্রবন্ধকার ও উপন্যাসিক) তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা : ৬টি, জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লেখক হিসাবে পরিচিত ।

LEAVE A REPLY