৩৪৫ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে পাবনা সুগার মিলস

0
401

সেলিম আহমেদ, ঈশ্বরদী থেকে ॥ উত্তরাঞ্চলের রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পাবনা সুগার মিল। বর্তমানে এই মিলে মোট ৬০ একর জমি রয়েছে। যার মধ্যে ১৫ একর লেগুন ও রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া অবশিষ্ট ৪৫ একর জমিতে আবাসিক স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে। ১৯৯২ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাবনা সুগার মিলের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেন। ১৯৯৬-৯৭ মাড়াই মৌসুমে প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যায় পাবনা সুগার মিলটি। ১৯৯৭-৯৮ সালে বানিজ্যিক ভাবে এই মিলের উৎপাদন শুরু হয়। দির্ঘ ২০ বছর ধরে লোকশানের বোঝা মাথায় নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মিলের কার্যক্রম। এই মিলে ৭’শজন শ্রমিক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। ৩৪৫ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ায় অবস্থিত পাবনা সুগার মিলের ২০১৭-১৮ মৌসুমের আখ মাড়াই শেষ হয়েছে।

মিল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৬০ হাজার মেট্রিক টন আখ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিল। ৪২ দিন চালু থাকার পর এই মৌসুমের মতো মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। মিলের মাড়াই মৌসুমের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে শ্রমিক-কর্মচারীরা নিজেরাও আখ উৎপাদন শুরু করছেন। একই সাথে আখ চাষীদের আখের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চাষীদের আখের ফলন বৃদ্ধিতে নিয়মিত সেচ, সার ও কীটনাষক প্রদানের জন্য নানা ধরনের পরামর্শ প্রদান করে চলেছেন।

পাবনা সুগার মিলের ওয়াকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, মিলের নিজস্ব জমি না থাকায় আখ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছেনা। মিল থেকে প্রতি বছর মাড়াই মৌসুমে আখ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হলেও পর্যাপ্ত আখ চাষ না হওয়াতে লক্ষমাত্রা পূরণ হয়না। ফলে নির্ধারিত সময় মতো মিল উৎপাদন করতে পারেনা। মিলের মাড়াই মৌসুমের সময়সীমা বৃদ্ধিতে আমরা শ্রমিক কর্মচারীরাও নিজেদের সাধ্য মতো সকলেই আখ রোপন করে চলেছি। মিলের সীমানা প্রাচির থেকে পূর্বাংশে আখের জমি নষ্ট করে কৃষি জমিতে ইতোমধ্যে নিটল-টাটা গ্রুপ স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলশ্রুতিতে পাবনা চিনিকল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরে বিরুপ প্রভাব পড়বে। নিটল-টাটা গ্রুপের স্থাপনা অন্যত্র সরিয়ে সেই জমি চিনিকলের অনুকুলে অধিগ্রহণ করার দাবি তুলে বলেন সুগার মিল বাঁচাতে নির্মানাধিন স্থাপনা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে।

পাবনা সুগার মিলের ওয়াকার্স ইউনিয়নের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন বলেন, বর্তমানে এই মিলে মোট ৬০ একর জমি রয়েছে। যার মধ্যে ১৫ একর লেগুন ও রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া অবশিষ্ট ৪৫ একর জমিতে আবাসিক স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে। অলাভজনক এই মিলে বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পাবনা সুগার মিলের আরও জমির প্রয়োজন রয়েছে। প্রতি বছর এই মিলে চাষীরা যে আখ সরবরাহ করে থাকেন তাতে নির্ধারিত সময় মতো মিল চলতে চায়না। বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মিলের কর্মরত কর্মকর্তা এবং শ্রমিকেরা দির্ঘ দিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে এই মিলে মিনারেল ওয়াটার প্লান্ট অথবা অন্য কোন লাভজনক প্রকল্প স্থাপন করলে মিলটির লোকশানের বোঝা কমে যাবে।

বাংলাদেশ চিনিকল আখচাষি ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত আখ চাষী আলহাজ্ব শাহজাহান আলী পেঁপে বাদশা বলেন, এই মিলের চাহিদার চেয়ে তুলনামূলক আখ সরবরাহ অনেক কম। আখ স্বল্পতার কারণে প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। মিলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আখ চাষ বৃদ্ধি করতে হবে। পাবনা সুগার মিলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তনিত করতে হলে নতুন ভাবে জমি অধিগ্রহণ করে জুস প্লান্ট, মিনারেল ওয়াটার, রিফাইন্ড সুগার, বায়োফার্টিলাইজার প্লান্ট ইত্যাদি প্রকল্প স্থাপন করলে মিলটি লোকশানের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। সময় মতো চাষীদের আখ সরবরাহের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে হবে, তাহলে চাষীরা আখ চাষে উৎসাহিত হবে। এই মিলটি সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলের উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা নিয়ে আখের মূল্য বৃদ্ধি করে চাষীদের আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করে মাড়াই মৌসুমের সময়সীমা বাড়াতে হবে।

পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, পাবনা সুগার মিলে প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ মেট্রিকটন আখ মাড়াই করে বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিকটন চিনি উৎপাদন করার ক্ষমতা রয়েছে। মিলটির কোন পরীক্ষামূলক খামার না থাকায় আখের উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন ও চাষীদের মাঝে সরবরাহ করতে না পারায় চাষীরা আখচাষে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। ফলে চাষীরা মিলটিতে চাহিদা অনুযায়ি আখ সরবরাহ করতে পারছেন না। এছাড়া মিলটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে বহুমুখী উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহনের প্রয়োজন রয়েছে। পর্যাপ্ত জমি না থাকায় মিলের জুস প্লান্ট, মিনারেল ওয়াটার, কো-জেনারেশন প্লান্ট, রিফাইন্ড সুগার, বায়োগ্যাস ও বায়োফার্টিলাইজার প্লান্ট ইত্যাদি প্রকল্প স্থাপন করে উৎপাদন বহুমুখীকরণ সম্ভব হচ্ছেনা। মিলের বহুমুখীকরণ প্রকল্প স্থাপনের জন্য আরও জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক ড. আমজাদ হোসেন বলেন, চিনিকলের প্লান্টেশন বাড়াতে আমরা ভ্যারাইটি আখের উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন করে চলেছি। আমাদের উৎপাদিত আখের বীজ চাষীদের মাঝে ইতোমধ্যে প্রদান করা হয়েছে। নতুন জাতের এই আখ রোপন করে চাষীরা ভালো ফলন পেয়েছে। মিলের মাড়াই মৌসুমের সময়সীমা বৃদ্ধিতে এবং মিল চালু রাখতে আখের পাশাপাশি যে সমস্ত ফসল দিয়ে চিনি উৎপাদন হয় তা দিয়ে মিলকে চিনি উৎপাদনে যেতে হবে। মাড়াই মৌসুমে পর্যান্ত পরিমাণে আখ সরবরাহ করা হলে মিলের লোকশান কমে গিয়ে আগামিতে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তনিত হবে।

LEAVE A REPLY